জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট ছয় দফা দাবিতে রাজপথে নেমেছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই অভ্যুত্থানে নিহতদের বিচার, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, গ্যাস ও সারের সংকট দূর করা, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতির অবসান।
এসব দাবিকে সামনে রেখে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চ শুরু করেছে জোটটি। সামগ্রিক বাস্তবতায় এসব দাবির কোনোটিই খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানি সংকট ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাহীনতা—সব মিলিয়ে জনজীবন ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠেছে। জামায়াত ও তাদের রাজনৈতিক মিত্ররা এসব সংকট সামনে আনছে বলেই বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের পক্ষে মানুষের এই ক্ষোভ ও অসন্তোষকে নিছক বিরোধিতার অংশ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া সমীচীন হবে না।
তবে একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও সামনে আসছে: এই আন্দোলন কি শুধুই মানুষের দুর্ভোগ লাঘবের উদ্দেশ্যে, নাকি এর আড়ালে সরকারের ওপর রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে দেশকে অস্থিতিশীল করার কৌশল লুকিয়ে রয়েছে? আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও অবস্থানের মধ্যে কিছু স্পষ্ট দ্বন্দ্ব চোখে পড়ার মতো। প্রথমত, গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের প্রশ্ন। জামায়াত ও এনসিপি এমন একটি আবহ তৈরি করছে, যেন গণভোটের মাধ্যমেই অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের বিতর্কিত সব সংস্কার প্রস্তাবের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবতা এত সরল নয়। সংস্কারের পক্ষে জনগণের ম্যান্ডেটকে কার্যকর রূপ দিতে হলে তা বিদ্যমান সংবিধান ও সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। গণভোট রাজনৈতিক বৈধতা তৈরি করতে পারে, তবে তা কোনোভাবেই নির্বাচিত সংসদ বা প্রচলিত আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়াকে পাশ কাটানোর হাতিয়ার হতে পারে না।
বিএনপির অবস্থান নিয়ে সমালোচকদের যে ভাষ্য, তাও একপেশে। গণভোটের আগে দলটি জানিয়েছিল, তারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাবে এবং মতপার্থক্যের বিষয়গুলো পরবর্তীতে সংসদে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে। সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবেও বিএনপির স্পষ্ট আপত্তি ছিল। দলটির যুক্তি ছিল, এ ধরনের কোনো সংস্থার বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য হয়নি এবং সংবিধান সংশোধনের চূড়ান্ত এখতিয়ার কেবল সংসদেরই থাকা উচিত—কোনো অনির্বাচিত বা সংবিধানবহির্ভূত কর্তৃপক্ষের নয়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক অবস্থান। অথচ জামায়াত, এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস সংবিধান পর্যালোচনার জন্য গঠিত বিশেষ সংসদীয় কমিটি বর্জন করেছে এবং জামায়াত সেখানে কোনো সদস্যও মনোনয়ন দেয়নি। তা সত্ত্বেও কমিটি বিশেষজ্ঞ, রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন অংশীজনের মতামত গ্রহণের কাজ শুরু করেছে। ফলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক: সংবিধান সংস্কার যদি সত্যিই মূল অগ্রাধিকার হয়, তবে সংসদীয় আলোচনা বর্জন করে কেবল রাজপথেই কেন বিষয়টি আটকে রাখা হচ্ছে? এর পেছনে সংসদকে পাশ কাটিয়ে শক্তি প্রদর্শন করে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল স্পষ্ট।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় আন্দোলন ও প্রতিবাদের ভাষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু জোটের নেতাদের বক্তব্যে যেভাবে বারবার কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি, এমনকি আরেকটি ‘গণঅভ্যুত্থানের’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে, তা উদ্বেগের জন্ম দেয়। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার কর্মসূচিতে বাধা দিলে জনরোষের যে সতর্কবার্তা দিয়েছেন, তা গণতান্ত্রিক সমালোচনার সীমারেখা অতিক্রম করে একধরনের রাজনৈতিক ভয়ভীতি প্রদর্শনের শামিল। জনগণের ভোটে নির্বাচিত একটি সরকারের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব কেবল রাজপথের উত্তাপের মুখে ভেঙে পড়তে পারে না।
জ্বালানি সংকট নিয়ে জোটের অবস্থানেও দ্বৈততা লক্ষ্য করা গেছে। একদিকে তারা জ্বালানি সংকটের প্রতিবাদ করছে, অন্যদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম লংমার্চে শুরুতে ৫ থেকে ৬ হাজার গাড়ির বহরের পরিকল্পনা করেছিল। পরবর্তীতে তা কিছুটা কমিয়ে শেষ পর্যন্ত প্রায় দেড় হাজার গাড়ির বিশাল বহর নিয়ে কর্মসূচি পরিচালনা করা হয়। যেখানে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন অভিযোগ করেছেন, এই দীর্ঘ গাড়ির বহরে প্রায় এক লাখ লিটার তেল অপচয় হচ্ছে এবং রাস্তাঘাট অবরুদ্ধ করে মানুষের দুর্ভোগ ও জ্বালানি সংকট বাড়ানো হচ্ছে। যে রাজনৈতিক জোট সরকারের কাছে স্বচ্ছতা ও মিতব্যয়িতা দাবি করছে, তাদের এই বিশাল কর্মসূচির বিপুল অর্থের উৎস ও জ্বালানি ব্যয়ের বিষয়েও সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবি কোনো একমুখী প্রক্রিয়া হতে পারে না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা এবং এনসিপির বর্তমান মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে ওঠা নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ হওয়া নয় এবং তাঁর আত্মপক্ষ সমর্থনের পূর্ণ অধিকার রয়েছে। তবে এনসিপি যদি নতুন ধারার রাজনীতির দাবিদার হয়, তবে তাদের উচিত তদন্তকে স্বাগত জানিয়ে নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে সহযোগিতা করা।
একইভাবে জামায়াতও নৈতিক জবাবদিহির পরীক্ষায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি। নৈতিক অসদাচরণের অভিযোগে সম্প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে বহিষ্কার করতে বাধ্য হয়েছে তারা। এছাড়া দলীয় নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ জনমনে প্রশ্ন তৈরি করছে। যে দল রাজনীতিতে নৈতিকতা ও মূল্যবোধকে মূল ভিত্তি দাবি করে, তাদের সদস্যদের আচরণেও সেই শুদ্ধাচারের কঠোর প্রতিফলন থাকা আবশ্যক।
এর পাশাপাশি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে জামায়াতের বিতর্কিত অতীত এবং ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রশ্নও রাজনৈতিক পরিসরে প্রাসঙ্গিক। ইতিহাসকে পাশ কাটিয়ে বা ভুলে গিয়ে জাতীয় নেতৃত্বের স্থায়ী গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করা সম্ভব নয়। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক পুনর্বাসনের সুযোগ থাকলেও রাষ্ট্রের ঐতিহাসিক চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধকে অকপটে ধারণ করাই হবে যেকোনো দলের জন্য সঠিক পথ।
অবশ্য সরকারের দায়িত্বও এখানে সবচেয়ে বেশি। জ্বালানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দ্রব্যমূল্য ও সিন্ডিকেট কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সরকারের প্রধান পরীক্ষা। মানুষের ক্ষোভ ও সংকট বাস্তব; তাই বিরোধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের অজুহাত দেখিয়ে জনদুর্ভোগকে আড়াল করার সুযোগ নেই। সরকারকে স্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বাজার তদারকি বাড়াতে হবে এবং জনগণের আস্থা অর্জনে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
পরিশেষে, জামায়াত ও এনসিপির মতো রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—তারা কি সংসদীয় ব্যবস্থার ভেতরে থেকে ইতিবাচক ও দায়িত্বশীল বিরোধী রাজনীতি চর্চা করবে, নাকি প্রতিটি ইস্যুতে নতুন সংঘাত ও ‘গণঅভ্যুত্থানের’ হুমকি দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দেবে? গণতান্ত্রিক সমঝোতা ও রাজনৈতিক সংস্কারের সঠিক পথ রাজপথের সংঘাত নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি ও সংসদীয় কাঠামোর মাধ্যমেই নির্ধারিত হতে হবে।
kalprakash.com/IM