২০১৫ সালে তৎকালীন বিএনপির মুখপাত্র ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনার তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম। তিনি জানান, তদন্তে আসামিদের বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ও অকাট্য তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং প্রসিকিউশন দ্রুতই আদালতে আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন দাখিল করতে যাচ্ছে।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় সালাহউদ্দিন আহমদকে কীভাবে এবং কী প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ থেকে ভারতে নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যের পাশাপাশি ভারতে তাঁর বিরুদ্ধে হওয়া ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’-এর মামলার সম্পূর্ণ অনুলিপি ও সাক্ষ্য-প্রমাণও সংগ্রহ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম।
চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানান, এ মামলার অনেক আসামি ইতোমধ্যে কারাগারে রয়েছেন এবং বাকিদের বিষয়ে তদন্ত চলছে। তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফলের ভিত্তিতে অন্যান্য অভিযুক্তদেরও দ্রুত আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া গ্রহণ করা হবে।
২০২৫ সালের ৫ জুন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে গুমের অভিযোগ দায়ের করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করা হয়। অন্য অভিযুক্তরা হলেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, সাবেক মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সাবেক কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া এবং পুলিশের বিশেষ শাখার (এসবি) সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও অনেকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে জিয়াউল আহসানকে ইতোমধ্যে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে।
চিফ প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে উঠে এসেছে সালাহউদ্দিন আহমদকে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপহরণ করে প্রায় ৬১ দিন টিএফআই সেলে (যা ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত) আটকে রাখে। এরপর অত্যন্ত সংগোপনে তাঁকে ভারতের মেঘালয়ের শিলংয়ে নিয়ে ফেলে রেখে আসা হয়। সেখানে তিনি মানসিক ও শারীরিকভাবে মারাত্মক বিপর্যস্ত অবস্থায় ঘোরাফেরা করার সময় স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভারতে সালাহউদ্দিন আহমদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া ফরেনার্স অ্যাক্টের মামলায় ভারতীয় পুলিশের সাক্ষীরাও আদালতে স্বীকার করেছিলেন যে তিনি স্বেচ্ছায় ভারতে যাননি; বরং বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাঁকে অপহরণ করে সীমান্ত পার করে ফেলে রেখে গিয়েছিল। ফলে ভারতের নিম্ন আদালত ও পরবর্তী সময়ে আপিল আদালত উভয় জায়গাতেই তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাস পান। ভারতীয় আদালতের সেই সমস্ত নথিপত্র ও রায় এখন ট্রাইব্যুনালের মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।
যেভাবে শিলংয়ে পৌঁছান সালাহউদ্দিন আহমদ ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাতে রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে সালাহউদ্দিন আহমদ অপহৃত হন বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়। নিখোঁজের দীর্ঘ দুই মাস পর ১১ মে ভারতের মেঘালয়ের শিলং থেকে স্থানীয় পুলিশ তাঁকে উদ্ধার করে। বৈধ কাগজপত্র ছাড়া ভারতে প্রবেশের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে ফরেনার্স অ্যাক্টে মামলা দায়ের করা হলেও ২০১৮ সালে নিম্ন আদালতে এবং ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগেও তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে খালাস পান। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ট্রাভেল পাস পেয়ে ১১ আগস্ট দীর্ঘ ৯ বছর পর স্বদেশে ফিরে আসেন তিনি।
kalprakash.com/IM