দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার দায়ে পাঁচ বছরের জন্য অব্যাহতি পাওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. সুজন সেনের স্থায়ী অপসারণের দাবিতে বিভাগে তালা ঝুলিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
আজ রোববার (৩০ আগস্ট) বেলা ১২টায় বিভাগে তালা দিয়ে এ দাবি জানান তারা।
স্থায়ী বহিষ্কার ছাড়াও আরও পাঁচটি দাবি জানিয়েছেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে গঠিত সব তদন্ত কমিটির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ ও প্রমাণিত অভিযোগ এবং শাস্তির ভিত্তি স্পষ্ট করা; তদন্ত কমিটির সিদ্ধান্ত ও সুপারিশের পার্থক্যের ব্যাখ্যা দেওয়া এবং অসংগতি থাকলে পুনঃতদন্ত করা; দুর্নীতি ও অনিয়মে বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করে অর্থ পুনরুদ্ধার করা এবং বর্তমান শাস্তির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক রূপরেখা ঘোষণা করা।
চিত্রকলা, প্রাচ্যকলা ও ছাপচিত্র বিভাগের শিক্ষার্থী আসাদ সাদিক রাফি বলেন, “সুজন সেনের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত শেষে কমিটি স্থায়ী বরখাস্তের সুপারিশ করেছিল। কিন্তু তাকে মাত্র পাঁচ বছরের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার পরও কত টাকা আত্মসাৎ হয়েছে, কেন ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি এবং অযোগ্য থাকা অবস্থায় প্রায় এক দশকের বেতন-ভাতার বৈধতা কীভাবে নির্ধারণ করা হলো—এসব প্রশ্নের জবাব প্রশাসন দিতে পারেনি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা তদন্ত প্রতিবেদন চাইলেও তা পাইনি। এমনকি তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করেও প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। প্রশাসনের কোনো সাড়া না পাওয়ায় আমরা ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছি। দাবি পূরণ না হলে আগামীকাল থেকে আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।”
একই বিভাগের শিক্ষার্থী আছিয়া খাতুন বলেন, “আমরা দীর্ঘ দুই বছর ধরে শিক্ষক ড. সুজন সেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ করে আসছি। এ বিষয়ে প্রশাসনের কাছে প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার অভিযোগপত্র জমা দিয়েছি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর সর্বশেষ সিন্ডিকেটে তাকে পাঁচ বছরের অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এটিকে আমরা কোনোভাবেই শাস্তি হিসেবে মানি না। একজন অযোগ্য শিক্ষককে পাঁচ বছরের অব্যাহতি দিয়ে বেতন-ভাতা প্রদান এবং পরবর্তীতে আবার শিক্ষক হিসেবে ফিরিয়ে আনা কীভাবে শাস্তি হতে পারে—এটাই আমাদের প্রশ্ন।”
তিনি আরও বলেন, “রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আইন ১৯৭৩-এর ৭৩(১) ধারা অনুযায়ী নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হলে চাকরিচ্যুতির সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে। তদন্ত কমিটিও তাকে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুতির সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশ উপেক্ষা করে কেন পাঁচ বছরের অব্যাহতি দেওয়া হলো, প্রশাসনকে তার জবাব দিতে হবে। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের বিষয়ে প্রশাসনের সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত না এলে আমরা আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।”
বিভাগের আরেক শিক্ষার্থী সরোয়ার জাহান বলেন, “সংশ্লিষ্ট শিক্ষক দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বলে আমরা নিশ্চিত। অথচ তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা কেন সীমিত রাখা হলো, তা নিয়ে আমরা সন্দিহান। আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকাশ ও তাকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের দাবি জানাচ্ছি। অন্যথায় আরও কঠোর কর্মসূচিতে যেতে বাধ্য হব।”
এর আগে গত বছরের ২৫ আগস্ট অযোগ্যতা, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলে ড. সুজন সেনকে বিভাগে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। পরবর্তীতে ৮ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, ছাত্র উপদেষ্টা ও বিভাগের সভাপতির কাছে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য-প্রমাণসহ প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ দেন তারা। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ জিয়াউর রহমান হলের প্রাধ্যক্ষ থাকাকালে তার বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও সামনে আনা হয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত জরুরি সভায় ড. সুজন সেনকে বিভাগের সব ধরনের কার্যক্রম থেকে সাময়িক অব্যাহতি দেওয়া হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে ১৮ সেপ্টেম্বর একটি কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
সর্বশেষ গত ১৭ আগস্ট বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ওই শিক্ষককে পাঁচ বছরের জন্য একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম থেকে অব্যাহতি দেয় এবং সহযোগী অধ্যাপক পদ থেকে পদাবনতি দিয়ে সহকারী অধ্যাপক করে। একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছর তার সব ধরনের ইনক্রিমেন্ট স্থগিতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
kalprakash.com/IM