সুন্দরবনের কেওড়া ফলকে ঘিরে উপকূলীয় অঞ্চলে তৈরি হচ্ছে নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা। দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত এই ম্যানগ্রোভ ফলটির পুষ্টিগুণ ও বহুমুখী বাণিজ্যিক ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় আশাব্যঞ্জক তথ্য উঠে এসেছে।
Sonneratia apetala বৈজ্ঞানিক নামের কেওড়া সুন্দরবন ও বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত পরিবেশে প্রাকৃতিকভাবেই বেড়ে ওঠে। সাধারণত আগস্ট থেকে অক্টোবরের মধ্যে এর ফল পাওয়া যায়। ফলটি টক স্বাদের হওয়ায় স্থানীয়ভাবে ডাল, মাছ, ভর্তা, আচার ও চাটনিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া গবেষণায় কেওড়া থেকে জ্যাম, জেলি ও অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত খাদ্য তৈরির উজ্জ্বল সম্ভাবনাও দেখা গেছে।
কেওড়া ফলের পুষ্টিগুণ নিয়ে একাধিক বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিচালিত হয়েছে। এসব গবেষণায় এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি, পলিফেনল, ফ্ল্যাভোনয়েড, বিভিন্ন ফেনোলিক যৌগ এবং শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্টের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। পাশাপাশি কেওড়া ফলে পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও জিংকের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদান শনাক্ত হয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, এসব উপাদানের উপস্থিতি কেওড়াকে কোনো নির্দিষ্ট রোগের একক চিকিৎসা বা প্রতিষেধক হিসেবে প্রমাণ করে না; এর স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন।
উপকূলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতেও কেওড়ার অপরিহার্য ভূমিকা রয়েছে। এর ফল হরিণ, বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখির প্রধান খাদ্য। এছাড়া কেওড়া ফুলে প্রচুর মৌমাছির বিচরণ থাকায় সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মধু উৎপাদনেও এ গাছের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, স্থানীয় উদ্যোক্তারা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কেওড়া সংগ্রহ করে আচার, চাটনি, জ্যাম ও জেলি তৈরি করতে পারলে উপকূলীয় নারীদের ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, মান নিয়ন্ত্রণ, আধুনিক প্যাকেজিং এবং টেকসই বাজারব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সম্পদ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে বনের বাস্তুতন্ত্র ও পরিবেশগত ভারসাম্য অক্ষুণ্ণ রাখা আবশ্যক। টেকসই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কেওড়া ফলের যথাযথ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বাজারজাতকরণ করা গেলে তা উপকূলের মানুষের আয় বৃদ্ধির পাশাপাশি সুন্দরবনের এই গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদ সংরক্ষণেও সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়াবে।
kalprakash.com/IM