কোনো প্রকার পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জনপদ। চোখের পলকে তীব্র পানির স্রোতে ভেসে গেছে একের পর এক গ্রাম, হাটবাজার, পাকা সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সেতু। প্রলয়ঙ্করী এই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এখন পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে এবং এখনও নিখোঁজ রয়েছেন সহস্রাধিক মানুষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়াদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ধারণা, একটি হিমবাহ ধসে ভোতে কোশী নদীর উপনদী লেন্দে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হঠাৎ পানির চাপ ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। পরবর্তীতে সেই প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বিপুল পরিমাণ পানি ও পলিমাটির তীব্র স্রোত প্রথমে নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়াগড়ির নিকটবর্তী তিমুরে এলাকায় আছড়ে পড়ে। মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে পানির এই তোড় ভাটির দিকে ধেয়ে গিয়ে রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করে। ঘরবাড়ি ও বাজার কয়েক মিটার পুরু কাদা ও পলিমাটির নিচে চাপা পড়ায় জীবিতদের সন্ধান ও উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।
নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারের এক ব্যবসায়ী সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে নিজের মর্মস্পর্শী অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘বন্যা আঘাত হানার কয়েক মুহূর্ত আগে প্রশাসনের লোকজন উঁচু স্থানে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সময় এতটাই কম ছিল যে চোখের সামনেই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বহু মানুষ ভেসে যান। আমার ১৮ বছর বয়সী ছেলে ও স্ত্রী চোখের সামনেই স্রোতে তলিয়ে গেছে, এখনো তাঁদের কোনো সন্ধান পাইনি।’ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওই এলাকায় সেদিন ভারী বৃষ্টিপাত না হওয়ায় মানুষ স্বাভাবিক কাজকর্মেই ব্যস্ত ছিলেন, ঠিক তখনই হঠাৎ কাদা ও পানির বিশাল প্রাচীর আছড়ে পড়ে।
ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে রাসুয়ার প্রধান শুল্ক কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা জানান, হঠাৎ ভূকম্পনের মতো অনুভূতি পেয়ে তিনি বাইরে বেরিয়ে আসেন এবং উজান থেকে তিমুরে বাজারের দিকে প্রায় ১০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মতো পানির স্রোত ধেয়ে আসতে দেখেন। মুহূর্তের মধ্যেই পুরো তিমুরে বাজার নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। তিনিসহ বেশ কয়েকজন কোনোমতে পাশের পাহাড়ি জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে প্রাণ বাঁচান। এ সময় সীমান্তের কাস্টমস চেকপয়েন্টে অপেক্ষমাণ তিন শতাধিক পণ্যবাহী ট্রাক ও যাত্রীবাহী গাড়ি স্রোতে ভেসে যায়।
নেপাল সরকারের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং ৮২৩ জন ব্যক্তির সঙ্গে এখনো যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানিয়েছেন, নিখোঁজদের মধ্যে প্রায় তিন শতাধিক ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন, যাদের একটি বড় অংশই কৈলাস মানস সরোবরগামী পুণ্যার্থী।
অন্যদিকে চীনের তিব্বত অঞ্চলের জিরং কাউন্টিতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, তিব্বতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক। সেখানে ৩ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুই দেশের তালিকা মিলিয়ে নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে।
ভয়াবহ এই মানবিক বিপর্যয়ে নেপালের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। যুক্তরাষ্ট্র জরুরি ত্রাণ সহায়তা হিসেবে ৫ লাখ ডলার এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ ফেডারেশন (আইএফআরসি) ১৪ লাখ ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য কোপারনিকাস স্যাটেলাইট ব্যবস্থা সক্রিয় করেছে এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা পাঠিয়েছে জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ ভারত প্রাথমিকভাবে ১০ টন মানবিক ত্রাণ পাঠিয়েছে।
kalprakash.com/IM