হিমালয়ে ঘটে যাওয়া কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ কেবল পাহাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না—এর ক্ষতিকর প্রভাব সরাসরি সমতলে নেমে আসে এবং নদীপথে বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। নেপালের সাম্প্রতিক ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার প্রেক্ষাপটে এমনই বাস্তবধর্মী সতর্কবার্তা দিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। তাঁর ভাষায়, ‘হিমালয়ে যা গলে, তা শেষ পর্যন্ত সমুদ্রে গিয়েই মেশে।’ তাই হিমালয়ের পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবিলায় সব ধরনের রাজনৈতিক মতপার্থক্য ভুলে নেপাল, ভারত, চীন ও ভুটানকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) কাঠমান্ডুতে আয়োজিত ‘এনডিটিভি ওয়ার্ল্ড অন্বেষণ সামিট’-এ বক্তব্য দেওয়ার সময় ভারত-নেপাল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন পরিবেশগত বাস্তবতার আলোকে বিবেচনা করার আহ্বান জানান শিশির খানাল। তিনি বলেন, দুই দেশ দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের সম্পর্ককে ‘রুটি-বেটি’ ও ‘সীতা-রাম’-এর মতো গভীর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মেলবন্ধনের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করে আসছে। এসব ঐতিহাসিক সংযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমান বাস্তবতায় পরিবেশগত সহযোগিতাকেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে গত বুধবারের প্রলয়ঙ্করী আকস্মিক বন্যার প্রসঙ্গ তুলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, পাহাড়ের কোনো ফাটল থেকে নেমে আসা পানির তোড় কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ভাটির জনপদগুলোকে তছনছ করে দিতে পারে, তা এবার প্রত্যক্ষ করা গেছে। এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে হিমালয়ের পরিবেশগত নিরাপত্তা কোনো একটি একক দেশের বিষয় নয়।
শিশির খানালের মতে, চীন, নেপাল, ভারত ও ভুটান একই বৃহৎ হিমালয়ভিত্তিক বাস্তুসংস্থানের অংশ। ফলে একটি দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হলে তা অন্য দেশের নদী, কৃষি, জনজীবন ও পানির নিরাপত্তাকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তিনি স্পষ্ট করেন যে পারস্পরিক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা বা মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু হিমালয়ের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্নে এই চার দেশকে একযোগে কাজ করতে হবে।
তিনি আরও জানান, এবারের বন্যায় নেপাল সীমান্তবর্তী ভারতের এলাকাগুলো বড় ধরনের ক্ষতির মুখে না পড়লেও ঝুঁকিটি পুরোপুরি অমূলক ছিল না। কারণ নেপাল থেকে গণ্ডক (নারায়ণী) ও কোশী নদীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীগুলো সরাসরি ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারের সমভূমির দিকে প্রবাহিত হয়েছে। বুধবার আকস্মিক বন্যার খবর ছড়িয়ে পড়ার পরই উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয় এবং জরুরি সতর্কতা জারি করা হয়। পাহাড়ি অঞ্চলে কোনো বড় দুর্যোগ ঘটলে তার প্রতিক্রিয়া দ্রুত ভারতীয় সমভূমিতেও আছড়ে পড়তে পারে।
শুধু বন্যা নয়, হিমালয়ের পরিবেশগত পরিবর্তন অদূর ভবিষ্যতে ভয়াবহ পানিসংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের তীব্রতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই ঝুঁকি আরও বাড়বে, যার প্রভাব পড়তে পারে এই অঞ্চলের প্রায় দুই শত কোটি মানুষের বিশুদ্ধ পানির প্রাপ্যতার ওপর। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিকে কেবল পরিবেশগত সংকট হিসেবে না দেখে সরাসরি ‘সভ্যতার জন্য হুমকি’ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি অভিন্ন হিমালয় রক্ষায় দ্রুত কার্যকর আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের তাগিদ দেন।
kalprakash.com/IM