রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েলসহ পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে ধর্ষণ কিংবা ধর্ষণচেষ্টার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক। ময়নাতদন্ত ও পরীক্ষাগারে পাঠানো নমুনার অণুজীববিজ্ঞান (মাইক্রোবায়োলজি) পরীক্ষার চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
বুধবার (২৬ আগস্ট) সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান রংপুর মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস। তিনি জানান, গণপতি চক্রবর্তীর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীর মরদেহ পরীক্ষার সময় কোনো ধরনের যৌন নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো সোয়াবের নমুনা পরীক্ষাতেও ধর্ষণের সপক্ষে কোনো আলামত বা প্রমাণ মেলেনি।
এর আগে চার সদস্যের ময়নাতদন্ত নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের এক ডোমের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে দুই নারী মরদেহে শুক্রাণু পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছিল। তবে চিকিৎসকেরা এই দাবি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করে দিয়েছেন।
ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, ‘ময়নাতদন্তের সময় সংগৃহীত সোয়াব মাইক্রোবায়োলজি ল্যাবে পাঠানো হয়েছিল। ল্যাব পরীক্ষার প্রতিবেদনে এ ধরনের কোনো আলামতের উল্লেখ নেই। ফলে ডাক্তারি পরীক্ষার ফল অনুযায়ী ধর্ষণের অভিযোগ পুরোপুরি নাকচ করা যায়।’ ডোম কেন এমন দাবি করেছিলেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সোয়াব সংগ্রহের সময় হয়তো তার মনে কোনো ধারণা তৈরি হতে পারে, যা সে বাইরে প্রকাশ করেছে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার রিপোর্টে ধর্ষণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এদিকে চারজনের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে ময়নাতদন্তকারী এই চিকিৎসক জানান, চারটি মরদেহের গলাতেই স্পষ্ট দাগ পাওয়া গেছে। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে। কারও শরীরে ধারালো অস্ত্রের কোনো কাটাছেঁড়ার ক্ষত ছিল না। তবে কয়েকজনের মাথা ও বুকে ভোঁতা বস্তুর আঘাতজনিত ফোলা জখমের চিহ্ন ছিল।
মরদেহের অবস্থা তুলে ধরে ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস বলেন, মরদেহগুলো যখন হাসপাতালে আনা হয়, তখন দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হওয়ায় সেগুলো ফুলে গিয়েছিল এবং পোকায় আক্রান্ত হয়েছিল। ফলে শরীরের স্বাভাবিক অবয়বে বিকৃতি দেখা দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চারজনের মুখে পোড়া দাগ বা রাসায়নিক ব্যবহারের যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে, তাও সঠিক নয় বলে জানান তিনি। তাঁর ব্যাখ্যায়, মৃত্যুর পর সময় গড়ালে ত্বকের স্বাভাবিক পরিবর্তন ও পচনের কারণে শরীর কালচে রূপ নিতে পারে; এর সঙ্গে কোনো রাসায়নিক ব্যবহারের সম্পর্ক নেই।
উল্লেখ্য, রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে চাকরি থেকে অবসরে যান। এরপর নগরীর মাছুয়াপাড়া (দাসপাড়া) এলাকায় জমি কিনে বাড়ি তৈরি করে প্রায় তিন বছর ধরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছিলেন। গত শনিবার ওই বাড়ি থেকে গণপতি চক্রবর্তী (৬০), তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা (৫০), স্নাতকোত্তর পড়ুয়া মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তীর (১২) মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
চাঞ্চল্যকর এই চার খুনের মামলার তদন্তভার কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছ থেকে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছেন ডিবির পরিদর্শক জিনাত আলী।
kalprakash.com/IM