হিমালয়ের বুক চিরে নেমে আসা ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে নেপাল ও তিব্বতের সীমান্তবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চল। কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত মুহূর্তের মধ্যে গুঁড়িয়ে দিয়েছে একের পর এক গ্রাম, বাজার, সড়ক, সেতু ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র। ভয়াবহ এই দুর্যোগে এখন পর্যন্ত নেপাল ও তিব্বত মিলিয়ে অন্তত ১৬৫ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন শত শত মানুষ, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিদেশি পর্যটকও রয়েছেন। এদিকে পরিস্থিতি বিবেচনায় ভারতের সীমান্তবর্তী কয়েকটি রাজ্যেও বন্যা সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত লেন্দে নদীর তীরে কাদা ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ার পর এই ভয়াবহ দুর্যোগের সূত্রপাত হয়। মুহূর্তেই সেই বিধ্বংসী স্রোত নদীপথে ছড়িয়ে পড়ে এবং ভোতে কোশী ও ত্রিশূলী নদীর তীরবর্তী জনপদগুলোতে আছড়ে পড়ে। প্রবল স্রোতের তোড়ে বহু ঘরবাড়ি, পাকা সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে গেছে। সীমান্তের উভয় পারের প্রশাসনিক কর্মকর্তারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।
দুর্যোগের ভয়াবহতা তুলে ধরে আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ ফেডারেশনের (আইএফআরসি) নেপাল প্রধান ডেভিড ফিশার জানান, পানির তোড়ে একাধিক গ্রাম ও বাজার এলাকা পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। আকাশ থেকে ধারণ করা উদ্ধার অভিযানের ফুটেজেও এই ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র স্পষ্ট হয়েছে; কোথাও শুধু কাদামাখা বাড়ির কঙ্কাল দাঁড়িয়ে আছে, আবার কোথাও বহুতল ভবনের নিচতলা পুরোপুরি কাদা ও পানিতে তলিয়ে গেছে।
নেপালি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশটিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ১৬২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে এবং নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৪০৩ জন। নিখোঁজদের মধ্যে ১৪২ জন ভারতীয় নাগরিক রয়েছেন। এছাড়া অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, নেদারল্যান্ডস, পর্তুগাল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও নিখোঁজদের তালিকায় আছেন। নেপালি সেনাবাহিনী ও পুলিশ হেলিকপ্টারের সাহায্যে দুর্গম পাহাড়ি এলাকা থেকে জীবিতদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে। একই সঙ্গে নদীর তীরবর্তী ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বত অঞ্চলের জিরং এলাকাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেখানে ৩ জন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। সীমান্ত এলাকার নজরদারি ফুটেজে দেখা গেছে, বহুতল ভবনের সমান উঁচু কাদা ও পানির স্রোত মুহূর্তেই অবকাঠামো গ্রাস করছে, আর মানুষজন প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক ছুটছেন। প্রবল স্রোতে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়ি খেলনার মতো ভেসে যেতে দেখা গেছে।
দুর্যোগের প্রাথমিক ধাক্কা কাটতে না কাটতেই নতুন করে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী নদীর উজানে এখনো বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ আটকে থাকায় যেকোনো মুহূর্তে ফের আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিআইএমওডি) জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং বলেন, নদীর উজানে প্রাকৃতিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হওয়ায় দ্বিতীয় দফায় বন্যার প্রবল ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা নিয়ে সতর্ক থাকতে হবে।
এদিকে নেপালের এই বন্যার প্রভাব সীমান্ত পেরিয়ে ভারতেও পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দেশটির উত্তর প্রদেশ ও বিহারের সীমান্তবর্তী কয়েকটি জেলায় ইতোমধ্যে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করেছে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে চরম আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি ও হিমবাহ ধসের প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি আরও প্রকট রূপ নিচ্ছে।
kalprakash.com/IM