হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করতে প্রতিবেশী ওমানের সঙ্গে আবারও আলোচনা শুরু করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক চাপ এবং চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যেই এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান।
মঙ্গলবার ইরান ও ওমান জানিয়েছে, তারা হরমুজ প্রণালিতে একটি যৌথ অস্থায়ী নৌ চলাচল করিডর গঠনের বিষয়ে আলোচনা করেছে। পাশাপাশি প্রণালিটি থেকে মাইন অপসারণের বিষয়েও উভয় দেশ নীতিগতভাবে একমত হয়েছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের প্রায় ২০ শতাংশই সংঘাত শুরুর আগে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো। তবে ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত শুরুর পর থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক নৌপথে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও দাবি করেছেন, হরমুজ প্রণালির সব মাইন অপসারণ করা হয়েছে। এর আগেও তিনি একই ধরনের বক্তব্য দিয়েছিলেন।
যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি সামরিক সংঘাতের মাত্রা অনেকটাই কমেছে, তবুও কার্যকর কোনো শান্তিচুক্তি না হওয়ায় কূটনৈতিক অগ্রগতি থমকে আছে। ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল এখনও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ রয়ে গেছে।
মঙ্গলবার ওমানের আশ শিসাহ উপকূলের কাছে, হরমুজ প্রণালির প্রবেশমুখ থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দূরে একটি তেলবাহী জাহাজ অজ্ঞাত ক্ষেপণাস্ত্র বা প্রজেক্টাইলের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত ও অচল হয়ে পড়ে। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
অন্যদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সম্প্রচারিত একটি ভিডিও ফুটেজকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক ও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। তিন মিনিটের ওই ভিডিওতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কনিষ্ঠ ছেলে ২০ বছর বয়সী ব্যারন ট্রাম্পকে হত্যার কথিত ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনা করা হয়। সেখানে দাবি করা হয়, ব্যারনের ওপর নজরদারি চালানো হচ্ছে এবং তাকে হত্যার জন্য এক কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
এ বিষয়ে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস জানিয়েছে, তারা ভিডিওটির বিষয়ে অবগত রয়েছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি কূটনৈতিক মিশনে আবারও কর্মী ফেরানো শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর আগে ইরান-সংকটের কারণে এসব দূতাবাস থেকে কর্মী সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল অথবা কার্যক্রম সীমিত করা হয়েছিল।
রয়টার্সের দুটি সূত্র জানিয়েছে, প্রাথমিকভাবে কিছু দূতাবাস পূর্ণ সক্ষমতায় কাজ শুরু না করলেও ওয়াশিংটন মনে করছে, স্বল্পমেয়াদে বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকি কিছুটা হ্রাস পেয়েছে।
এদিকে ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তেহরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালিয়ে যাওয়া দেশগুলোর বিরুদ্ধেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে তাৎক্ষণিকভাবে নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হবে না বলেও জানিয়েছে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপকে ‘চরম আইনহীনতা’ আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ইরান। তেহরানের দাবি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বহু দেশই ওয়াশিংটনের এমন অন্যায্য চাপের সঙ্গে একাত্ম হবে না।
এদিকে নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার হুমকির পরও আন্তর্জাতিক বাজারে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো জ্বালানি তেলের দাম কমেছে। বাজার বিশ্লেষকরা আপাতত যুক্তরাষ্ট্রের এই হুঁশিয়ারিকে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ক্ষেত্রে বড় কোনো তাৎক্ষণিক ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন না।
রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক এক যৌথ জনমত জরিপে দেখা গেছে, ইরান-সংক্রান্ত যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের সমর্থন সংঘাতের শুরুর সময়ের তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে আগামী নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাও রেকর্ড নিম্নমুখী।
চলমান এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার সিংহভাগই ইরান ও লেবাননে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের তীব্র হামলায় ইরানের প্রচলিত সামরিক সক্ষমতার একটি বড় অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির বর্তমান অবস্থা এখনও স্পষ্ট নয়।
kalprakash.com/IM