তিন দশক আগের পুরোনো অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ নীতিতে ফিরেছে সরকার। তবে ১৯৯৪ সালের সেই তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে বাজারে সরবরাহ মিলছে মাত্র ৬০টির, আর সরবরাহ বন্ধ রয়েছে ৫৭টির। ফলে জীবনরক্ষাকারী ও অতিপ্রয়োজনীয় ওষুধের অভাবে নিম্ন আয়ের মানুষ ও দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত সাধারণ রোগীদের চিকিৎসার ব্যয় বহুগুণ বেড়ে গেছে।
গত ১০ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত রাজধানীর মিটফোর্ড, কলাবাগান, গুলশান ও শাহবাগ এলাকার আটটি ফার্মেসির ওপর পরিচালিত এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অত্যাবশ্যকীয় ১১৭টি ওষুধের মধ্যে প্রায় অর্ধেকই (৫৭টি) বাজারে দীর্ঘ দিন ধরে অনুপস্থিত। অথচ ১৯৯৪ সালের গেজেট অনুযায়ী, দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট উৎপাদনের ৩০ শতাংশ অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যা কখনোই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা হয়নি।
উদ্বেগের বিষয় হলো, বাজারে অনুপস্থিত ওষুধের তালিকায় রয়েছে তীব্র ব্যথা নিয়ন্ত্রণের পেথিডিন, মানসিক রোগের ক্লোরপ্রোমাজিন ও প্রোক্লোরপেরাজিন; ম্যালেরিয়ার ক্লোরোকুইন, কুইনাইন ও মেফ্লোকুইন; যক্ষ্মার ইথামবিউটল ও আইসোনিয়াজিড এবং কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্লোফাজিমিন ও ড্যাপসোন। অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের গ্লিবেনক্লামাইড এবং হৃদরোগ ও উচ্চ রক্তচাপের নিফেডিপিন, মেথাইলডোপা ও আইসোসরবাইড ডাইনাইট্রেট বাজারে অমিল। পাশাপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় সংক্রমণের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ক্লক্সাসিলিন, অ্যামক্সিসিলিন, অ্যাম্পিসিলিন, ক্লোরামফেনিকল ও পেনিসিলিনসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ অ্যান্টিবায়োটিকের সরবরাহও বন্ধ। এ ছাড়া বিষধর সাপের কামড়ে জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম, প্রসবকালীন রক্তপাত রোধের জরুরি ওষুধ অক্সিটোসিন ও এরগোমেট্রিন এবং ডিপথেরিয়া, ধনুষ্টঙ্কার, হাম, পোলিও ও মেনিনজোকক্কালের মতো গুরুত্বপূর্ণ টিকার সরবরাহ নেই বললেই চলে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আকতার হোসেন বলেন, “অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ উৎপাদনের বাধ্যবাধকতা অতীতে কখনোই মানা হয়নি। হাইটেক ওষুধের বাহবা চললেও সাধারণ মানুষের প্রয়োজনীয় ওষুধ উৎপাদনে চরম অবহেলা দৃশ্যমান। কেবল কমিটি গঠনে আটকে না থেকে প্রশাসন ও মন্ত্রণালয়ের এখনই কঠোর তদারকি করা উচিত।”
সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশে অনুমোদিত ৩০১টি অ্যালোপ্যাথিক কোম্পানির মধ্যে নিয়মিত উৎপাদনে রয়েছে ১৫০ থেকে ২০০টি প্রতিষ্ঠান। অনেক কোম্পানি লাভজনক না হওয়ায় এসব জরুরি ওষুধ তৈরি করে না। অন্যদিকে একই ওষুধ ভিন্ন ভিন্ন ব্র্যান্ড নামে বাজারজাত করায় সরকারি জেনেরিক তালিকার ওষুধ রোগীরা ফার্মেসিতে সহজে খুঁজে পান না।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) প্রতি দুই বছর পর পর তালিকা হালনাগাদ করে এবং তাদের সর্বশেষ তালিকায় ৫২৩টি ওষুধ থাকলেও বাংলাদেশে ৩০ বছর ধরে আধুনিক কোনো হালনাগাদ কার্যকর হয়নি। ২০১৬ সালে ২৮৫টি এবং ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে মোট ২৯৫টি ওষুধের তালিকা করা হলেও আইনি প্রক্রিয়া না মানার কারণে সরকার সম্প্রতি সেই তালিকা বাতিল করে ১৯৯৪ সালের পুরোনো তালিকায় ফিরে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ সিদ্ধান্ত জনস্বার্থের পরিপন্থী। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, “চিকিৎসায় প্রতি ১০০ টাকার মধ্যে ৮০ টাকাই রোগীকে নিজের পকেট থেকে ব্যয় করতে হয়, যার বড় অংশ ওষুধে যায়। আধুনিক তালিকা বাতিল করায় রোগীরা আধুনিক ওষুধের সুফল ও সাশ্রয়ী মূল্য থেকে বঞ্চিত হবেন।” জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন ১৯৯৪ সালের তালিকায় ফিরে যাওয়াকে অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে ২০২৬ সালের তালিকা সংশোধনের মাধ্যমে পুনর্বহালের দাবি জানান।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক জানান, দেশে বছরে ব্যবহৃত প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকার ওষুধের মধ্যে ৩৫ হাজার কোটি টাকাই মানুষ নিজের পকেট থেকে খরচ করে। পুরো সরবরাহ চেইনে স্বচ্ছতা ও জেনেরিক নামে ওষুধ বিক্রির ওপর জোর দেন তিনি।
এদিকে অভ্যন্তরীণ বাজারে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের সংকট থাকলেও দেশের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিক বাজারে সাফল্য দেখাচ্ছে। স্থানীয় চাহিদার ৯৮ শতাংশ পূরণ করে বর্তমানে বিশ্বের ১৩২টি দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে বাংলাদেশ। গত ১০ বছরে ওষুধ রপ্তানি ৮৯ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২৩৮ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে, যার প্রবৃদ্ধি প্রায় ১৬৭ শতাংশ।
kalprakash.com/IM