বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬ | ৪ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৬ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | রাত ১১:৪৭:৪৩

সোনা পাচারের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট বাংলাদেশ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট, ২০২৬, ৬:০৮
শেয়ার: mail
সোনা পাচারের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট বাংলাদেশ

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

সোনা পাচারের নিরাপদ ট্রানজিট রুট হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে আন্তর্জাতিক চোরাকারবারি চক্র। আকাশ, সমুদ্র ও স্থলপথ দিয়ে সৌদি আরব, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে চোরাই পথে প্রতিদিনই দেশে আসছে সোনা। এরপর সীমান্তের চোরাপথে সেই সোনা পাচার হয়ে যাচ্ছে ভারতে। অরক্ষিত তিন পথে প্রতিদিন চোরাচালানের মাধ্যমে কমপক্ষে ২৫০ কোটি টাকার স্বর্ণালংকার ও বার বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পরিচালিত শতাধিক অভিযানে বিমানবন্দরগুলো থেকে মোট ১ হাজার ৮৮০ কেজি সোনা উদ্ধার করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। একই সময়ে বৈধভাবে আসা সোনার বার ও অলংকার থেকে সরকার মোট ২৩৮ কোটি টাকা শুল্ক-কর আদায় করেছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যে পরিমাণ সোনা পাচার হচ্ছে, উদ্ধার হওয়া সোনার পরিমাণ তার তুলনায় যৎসামান্য। বিভিন্ন এয়ারলাইনসে করে প্রায় প্রতিদিনই অবৈধভাবে সোনার চালান আসছে বাংলাদেশে। চোরাচালানিরা ঢাকার হযরত শাহজালাল, চট্টগ্রামের শাহ আমানত ও সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ব্যবহার করছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বিভিন্ন কৌশল নিয়েও তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারছে না। সোনা পাচার বেড়ে যাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

সূত্র জানায়, বিমানবন্দরগুলো হয়ে আসা চোরাচালানের সোনা ৮টি সীমান্ত জেলার অন্তত ৯০টি পয়েন্ট দিয়ে ভারতে পাচার করা হচ্ছে। এসব সোনা চোরাচালানের সময় মাঝেমধ্যে বাহকরা গ্রেপ্তার হলেও মূল হোতারা সব সময়ই আড়ালে থেকে যাচ্ছেন।

ঢাকা কাস্টম হাউসের যুগ্ম কমিশনার মোহাম্মদ কামরুল হাসান বলেন, বিমানবন্দরে সোনা চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর নজরদারি অব্যাহত আছে। অনেকে সোনার চালান আনলেও কড়াকড়ির কারণে তা ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন। গোয়েন্দা তথ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে বহু অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সমন্বিত তৎপরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় সোনার চালান আসার হার আগের তুলনায় কমেছে।

সব বিমানবন্দরেই সক্রিয় সিন্ডিকেট

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই সিন্ডিকেটগুলো শাহজালাল, শাহ আমানত ও ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে সোনার চালান আনছে। এসব স্থানে চোরাকারবারিদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। এই চক্রের সঙ্গে দেশের কিছু জুয়েলারি দোকান মালিক ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিমান ও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও তাদের সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত অপরাধীরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

কাস্টমস ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কর্মকর্তারা জানান, যে পরিমাণ সোনা ধরা পড়ছে, বাস্তবে পাচার হচ্ছে তার কয়েক গুণ বেশি। মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকে সোনা এনে বাংলাদেশ ও প্রতিবেশী দেশের বাজারে সরবরাহ করতে নিত্যনতুন কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে।

গোয়েন্দাদের অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত ১০টি দেশের মাফিয়া ও আন্তর্জাতিক একাধিক চক্র এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত। চক্রে বাংলাদেশিদের পাশাপাশি ভারত, দুবাই, পাকিস্তান, সৌদি আরব ও চীনের অপরাধীরাও রয়েছে। তাদের কেউ কেউ আন্ডারওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। ইতোমধ্যে পুলিশ সদর দপ্তর এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর ২০৯ জন চোরাকারবারির একটি তালিকা তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে।

সীমান্তজুড়ে সক্রিয় ৯০টি রুট

গোয়েন্দা তথ্যমতে, চোরাচালানের সোনার সিংহভাগই আসে মধ্যপ্রাচ্য থেকে, যার মধ্যে দুবাইকে ট্রানজিট হাব হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ওমান, কাতার, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর থেকেও বড় চালান আসে।

আকাশপথে আসা সোনা নির্দিষ্ট কর্মীদের সহায়তায় বিমানবন্দর থেকে বের করে রাজধানীর বিভিন্ন নিরাপদ স্থানে মজুত করা হয়। সেখান থেকে ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে সড়কপথের দূরপাল্লার বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, রেলপথ ও কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে সীমান্ত জেলাগুলোতে পাঠানো হয়। বিশেষ করে যশোরের শার্শা উপজেলার কায়বা, অগ্রভুলোট, পাঁচভুলোট, বেনাপোলের পুটখালী ও দৌলতপুর এবং চৌগাছা উপজেলার শাহজাদপুর, মাসিলা, কাঠগড়, আন্দুলপোতা ও কাবিলপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ ও উত্তর চব্বিশ পরগনার এজেন্টদের হাতে তুলে দেওয়া হয়।

সূত্র জানায়, সোনা ঢাকা থেকে যশোর সীমান্তে পৌঁছাতে তিন-চারবার হাতবদল হয় বিশেষ সংকেত বা পাসওয়ার্ডের মাধ্যমে। এই প্রক্রিয়ায় এক স্তরের বাহক অন্য স্তরের মূল মালিক বা গ্রাহকের পরিচয় জানতে পারে না। ফলে মাঝপথে বাহক ধরা পড়লেও মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ভারতে সোনার আমদানি শুল্ক বেশি হওয়ায় মুনাফার লোভে চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে নিরাপদ ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছে।

মামলার জট ও আড়ালে থাকা গডফাদার

সোনা চোরাচালানের ঘটনায় কাস্টমস আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইন, ১৯৭৪-এর অধীনে নিয়মিত মামলা দায়ের করা হচ্ছে। আইনে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হলেও মূলত মাঠপর্যায়ের বাহকরাই গ্রেপ্তার হচ্ছে। তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষীর অভাবে নেপথ্যে থাকা অর্থায়নকারী ও গডফাদারদের আইনের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।

তদন্তে হুন্ডি সংযোগ

জব্দকৃত সোনা আইনি প্রক্রিয়া শেষে বাংলাদেশ ব্যাংকের রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়া হয়। তবে সোনা জব্দের পাশাপাশি এর সঙ্গে জড়িত অবৈধ অর্থ লেনদেন এবং আন্তর্জাতিক হুন্ডি চক্রের সংযোগ খতিয়ে দেখতে মাঠপর্যায়ে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। এছাড়া সীমান্ত ও বিমানবন্দরগুলোতে গোয়েন্দা নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

সোনা পাচারের আন্তর্জাতিক ট্রানজিট রুট বাংলাদেশ

বিস্তারিত কমেন্টে