শুক্রবার, ২১ আগস্ট, ২০২৬ | ৫ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৭ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | রাত ১২:৩৯:২৯

রাবিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ছে, জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসা

হ্লাথোয়াইছা চাক, রাবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: রবিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৬, ১১:২৮
শেয়ার: mail
রাবিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ছে, জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসা

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে মানসিকভাবে সুস্থ থাকার তাগিদ ও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নেওয়ার প্রবণতা গত কয়েক বছরে ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র’-এর তথ্যে দেখা যায়, গত ছয় অর্থবছরে এ কেন্দ্র থেকে সেবা গ্রহণ করেছেন ৩ হাজার ৫৮ জন। তবে সেবার চাহিদা ব্যাপক বাড়লেও প্রয়োজনীয় কাউন্সেলর ও জনবল না থাকায় কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ।

কেন্দ্রটির দায়িত্বশীলরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সাধারণের সচেতনতা বাড়ার পাশাপাশি বিষণ্নতা ও উদ্বেগসহ নানা মানসিক ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যাও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে কেন্দ্রটির ওপর নিয়মিত চাপও আগের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০–২১ অর্থবছরে মাত্র ২৩২ জন সেবা গ্রহণ করেছিলেন। পরের অর্থবছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৩৮ জনে। ২০২২–২৩ অর্থবছরে তা সামান্য কমে হয় ৫২৩ জন। এরপর ২০২৩–২৪ অর্থবছরে ৫৪৩ জন এবং ২০২৪–২৫ অর্থবছরে ৫৪৯ জন সেবা নেন। সর্বশেষ ২০২৫–২৬ অর্থবছরে এই সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ বেড়ে ৬৭৩ জনে গিয়ে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র ছয় বছরের ব্যবধানে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা প্রায় তিন গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বিগত ছয় অর্থবছরে সেবা নেওয়া ৩ হাজার ৫৮ জনের মধ্যে ১ হাজার ৪৩৭ জন ছাত্র, ১ হাজার ৪২৩ জন ছাত্রী, ১০১ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা এবং ৯৭ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন। এদের মধ্যে ২ হাজার ৫৪১ জনকে পৃথক স্বতন্ত্র কাউন্সেলিং সেবা দেওয়া হয়েছে, যেখানে তারা মোট ১০ হাজার ১৫২টি ব্যক্তিগত সেশনে অংশ নেন। পাশাপাশি ১ হাজার ৩৯৭ জনকে মোট ২৬৪টি দলগত সেশন দেওয়া হয়েছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিবন্ধনের পরও ৩০২ জন রোগী কোনো সেশন গ্রহণ করেননি।

কেন্দ্রের চিকিৎসকরা জানান, সেবাগ্রহীতাদের মধ্যে তীব্র বিষণ্নতা, উদ্বেগ, প্যানিক ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার (ওসিডি), সিজোফ্রেনিয়া, বাইপোলার মুড ডিসঅর্ডার, পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, অমূলক ভয়, ঘুমের জটিলতা, মানসিক চাপ, আত্মহত্যাপ্রবণ চিন্তা, রাগ নিয়ন্ত্রণের সমস্যা, মাদকাসক্তি ও অটিজমসহ নানা ধরনের মানসিক জটিলতা দেখা যাচ্ছে।

এসব জটিল মানসিক সংকটের পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গেমস ও পর্নোগ্রাফিতে অতিরিক্ত আসক্তি, মাদকসেবন, পারিবারিক ও অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের টানাপোড়েন, যৌন হয়রানি, শৈশবের মানসিক ট্রমা, পরীক্ষায় খারাপ ফল, একাকীত্ব, ভবিষ্যৎ নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা এবং আত্মবিশ্বাসের ঘাটতির মতো ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক কারণগুলো চিহ্নিত করেছে কেন্দ্রটি।

মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অবৈতনিক ইন্টার্নি কো-অর্ডিনেটর মেহেদী হাসান বলেন, “বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ১৪ থেকে ২০ জন, ক্ষেত্রবিশেষে ২৫ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী কাউন্সেলিং নিতে আসেন। শুরুতে তাঁদের দিয়ে গোপনীয় তথ্যফরম পূরণ করানোর পর একাধিক সেশনের মাধ্যমে সমস্যার ধরন শনাক্ত করা হয়। কাউন্সেলর কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেন না; বরং সম্ভাব্য বিভিন্ন পথ দেখিয়ে শিক্ষার্থীকে নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে সহায়তা করেন। তবে গুরুতর আক্রান্ত ১০ থেকে ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে রেফার করে ওষুধের পরামর্শ দেওয়া হয়।”

তবে দিন দিন সেবার বহুগুণ চাহিদা বাড়লেও চরম জনবল সংকট কেন্দ্রটির পুরো কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে। কেন্দ্রটিতে বর্তমানে একজন ইন্টার্ন কো-অর্ডিনেটর ও তিনজন ইন্টার্নের মাধ্যমে পুরো কাজ সামাল দিতে হচ্ছে, যারা সবাই বিনাপারিশ্রমিকে বা নামমাত্র ভ্যতায় কাজ করছেন।

মেহেদী হাসান আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, “এখানে প্রশাসনিক সেবামূলক কাজ থেকে শুরু করে পিয়নের কাজও আমাকে একাই করতে হয়। ফলে সঠিক সেবাটা দিতে আমি হিমশিম খাচ্ছি।”

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিচালক ও মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এনামুল হক বলেন, “স্থায়ীভাবে পর্যাপ্ত কাউন্সেলর ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষার্থীরা আরও কার্যকর সেবা পাবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য প্রশাসনিক ইউনিটের মতো মানসিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটিকেও স্থায়ী কাঠামোর আওতায় আনা অত্যন্ত প্রয়োজন।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক মামুনুর রশীদ জানান, “চলতি অর্থবছরের বাজেটে এ খাতে কোনো বিশেষ বরাদ্দ না থাকায় প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ সম্ভব হয়নি। আগামী অর্থবছরের বাজেটে বা বিশেষ সরকারি প্রকল্পে কেন্দ্রটিকে আধুনিকায়ন ও পদ সৃষ্টির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”

আত্মহত্যার ক্রমবর্ধমান ঘটনায় উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার ঘটনাও ক্রমশ উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ১১ জন শিক্ষার্থী বিভিন্ন মানসিক চাপে পড়ে আত্মহত্যা করেছেন।

এদিকে ২০২৫ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, দেশের চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৭ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে উচ্চমাত্রার এবং ২৯ শতাংশের মধ্যে মাঝারি মাত্রার আত্মহত্যাপ্রবণতা কাজ করছে।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা মনে করেন, অতিরিক্ত ইন্টারনেট আসক্তি, পরিবারের সঙ্গে সামাজিক দূরত্বের সৃষ্টি ও ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাই তরুণ প্রজন্মকে সবচেয়ে বেশি মানসিক ঝুঁকির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এজন্য দ্রুত পারিবারিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যচর্চা বাড়ানোর ওপর তাগিদ দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
রোববার, ৯ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

রাবিতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার চাহিদা বাড়ছে, জনবল সংকটে ব্যাহত চিকিৎসা

বিস্তারিত কমেন্টে