জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ইনস্টিটিউট অব এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ (আইইআর) এখন তীব্র সেশনজটের প্রতীক হয়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগ যেখানে করোনা-পরবর্তী ক্ষতি কাটিয়ে দ্রুত ক্লাস ও পরীক্ষা সম্পন্ন করে সেশনজট নিরসনে সফল হয়েছে, সেখানে আইইআরের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকা, পরীক্ষার সূচি প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা এবং ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘ বিলম্বের কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবান সময়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর যেখানে আধুনিক শিক্ষা কার্যক্রম ও নিয়মতান্ত্রিক ব্যবস্থাপনায় এগিয়ে, সেখানে জবির এই ইনস্টিটিউট যেন অভিভাবকহীন ও স্থবির এক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। জানা গেছে, ইনস্টিটিউটের ১৬ থেকে ২০ ব্যাচ—প্রায় সব ব্যাচই বর্তমানে তীব্র সেশনজটের কবলে রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যান্য বিভাগের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীরা যেখানে মাস্টার্স শেষ করার পর্যায়ে, সেখানে আইইআরের ১৬ ব্যাচের শিক্ষার্থীদের এখনও অনার্স চতুর্থ বর্ষের দ্বিতীয় সেমিস্টার (৪-২) শেষ হয়নি। মিডটার্ম পরীক্ষা শেষ হলেও চূড়ান্ত পরীক্ষার রুটিন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ফলে সরকারি ও বেসরকারি চাকরির বিভিন্ন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে আবেদন করা থেকেও বঞ্চিত হওয়ার শঙ্কায় রয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
একইভাবে ১৭ ব্যাচের ৩-২ সেমিস্টারের মিডটার্ম পরীক্ষা গত ১ এপ্রিল শেষ হলেও এখনও চূড়ান্ত পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ হয়নি। ১৮ ব্যাচের আগের সেমিস্টারের ফলাফল এখনও প্রকাশ হয়নি। ৩-১ সেমিস্টারের মিডটার্ম শেষ করেও চূড়ান্ত পরীক্ষার অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের। অন্যদিকে ১৯ ব্যাচের ২-১ সেমিস্টারের ক্লাস ও মিডটার্ম শেষ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে ফাইনাল পরীক্ষার অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
সাধারণত একটি সেমিস্টার ছয় মাসের মধ্যে সম্পন্ন হওয়ার কথা থাকলেও আইইআরে মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসের একাডেমিক কার্যক্রম শেষ করতে আট থেকে নয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যাচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বর্তমানে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে পুরো ইনস্টিটিউটে স্থায়ী শিক্ষক রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক সংকট নিরসনে গেস্ট টিচার বা খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানানো হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সমাধান পাওয়া যায়নি। সম্প্রতি নতুন পরিচালক দায়িত্ব নিলেও অবস্থার দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি বলে অভিযোগ তাদের।
এর ওপর ফলাফল প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে। একটি সেমিস্টার শেষ হওয়ার পর প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও ফলাফল প্রকাশ করা হয় না। এমনকি দ্বিতীয় সেমিস্টার শেষ হওয়ার আগের দিন প্রথম সেমিস্টারের ফলাফল প্রকাশের মতো ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী জানান, তারা অধিকাংশই মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। দ্রুত পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার প্রয়োজন থাকলেও চার বছরের কোর্স ছয় বছরেও শেষ না হওয়ায় ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগছেন তারা। এছাড়া একাডেমিক সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গেলে ইন্টারনাল অ্যাসেসমেন্ট ও ভাইভায় হয়রানির আশঙ্কাও রয়েছে বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনে দ্রুত স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগ, অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে যোগ্য গেস্ট টিচারের মাধ্যমে ক্লাস পরিচালনা, পরীক্ষা শেষের এক মাসের মধ্যে ফলাফল প্রকাশ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় নীতিমালা অনুযায়ী চার থেকে পাঁচ মাসের মধ্যে সেমিস্টার সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
সার্বিক অচলাবস্থা ও কাঠামোগত সংকটের বিষয়টি স্বীকার করে আইইআরের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আজম খান বলেন, আমাদের এখানে শিক্ষক সংকটই মূল সমস্যা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআরে যেখানে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষক রয়েছেন, সেখানে আমাদের এখানে শিক্ষক মাত্র পাঁচজন। এই অল্পসংখ্যক শিক্ষক দিয়ে অনার্স ও মাস্টার্স মিলিয়ে পাঁচটি ব্যাচের প্রায় ২৫ থেকে ২৭টি কোর্সের ক্লাস কোনোভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ইউজিসি ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের জটিলতার কারণে নতুন শিক্ষকের পদ সৃষ্টি হচ্ছে না। সংকট নিরসনে বাইরে থেকে খণ্ডকালীন শিক্ষক আনার চেষ্টা করা হলেও দূরত্বের কারণে তারা নিয়মিত ক্লাস নিতে পারেন না। ফলে বর্তমান শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। একজন শিক্ষককে চার থেকে পাঁচটি কোর্স পড়াতে হচ্ছে, যা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়েও বেশি। এতে গবেষণা ও মানসম্মত পাঠদানের জন্য পর্যাপ্ত সময় পাওয়া যাচ্ছে না।
নতুন শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হলে প্রায় ৯০ শতাংশ সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন তিনি।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. রইছ উদ্দিন বলেন, আইইআরের শিক্ষক সংকট ও সেশনজট সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অবগত রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। ইউজিসির সঙ্গে যোগাযোগ করে নতুন শিক্ষকের পদ সৃষ্টির প্রক্রিয়া দ্রুত করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, খণ্ডকালীন শিক্ষক নিয়োগ এবং বিশেষ একাডেমিক ক্যালেন্ডার প্রণয়নের বিষয়েও ইনস্টিটিউট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীদের সেশনজট কমিয়ে এনে একটি সুন্দর শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে প্রশাসন বদ্ধপরিকর।
kalprakash.com/SAS
জবি প্রতিনিধি 
























