কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলায় একাধিক মাদক মামলার আসামির পক্ষে তদবিরের অভিযোগে বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম নিয়ে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিও কল রেকর্ডকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন ও স্থানীয় জনমনে এ আলোচনা শুরু হয়।
অভিযোগের তীর যাদের দিকে, তারা হলেন— বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য ও কুমিল্লা বারের সাবেক পিপি অ্যাডভোকেট আ হ ম তাইফুর আলম, উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন এবং সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির বাবুল।
অভিযোগ অনুযায়ী, সীমান্তবর্তী বুড়িচং উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চরণল গ্রামের বাসিন্দা, একাধিক মাদক মামলার আসামি এবং রাজাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবিরকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান থেকে রক্ষার চেষ্টা করা হয়। ভাইরাল হওয়া অডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, “থানাওয়ালা আইলে আমারে ফোন লাগাই দিও”, যা নিয়ে এলাকায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, পুলিশের অভিযানের খবর পেয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করেন অ্যাডভোকেট তাইফুর আলম। ফোনালাপে তিনি ওই ব্যক্তিকে সাহস জোগানোর মতো বক্তব্য দেন বলে অভিযোগ ওঠে। এসব তথ্য গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন হুমায়ুন কবির নিজেই।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর কুমিল্লা-৫ আসনের সংসদ সদস্য জসিম উদ্দিন নিজ এলাকায় মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছিলেন। প্রশাসনকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু এর মধ্যেই রাজনৈতিক পরিচয়ে মাদকসংশ্লিষ্টদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ সামনে আসায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, হুমায়ুন কবির দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রয়েছে। কয়েক দিন আগে বুড়িচং থানা পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলেও রহস্যজনকভাবে মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে বিষয়টি জনসমক্ষে আলোচিত হলে পুলিশ পুনরায় তাকে আটক করে।
অভিযোগ রয়েছে, দ্বিতীয়বার গ্রেপ্তারের পরও মাদক মামলার পরিবর্তে অন্য একটি মামলায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়, যাতে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগের প্রভাব কমানো যায়। পরদিনই জামিনে মুক্তি পাওয়ার ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে নিতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করা হয়। এমনকি থানার ওসির ওপরও চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ওয়ারেন্টভুক্ত আসামিকে মুক্তি দিতে অস্বীকৃতি জানান।
হুমায়ুন কবির দাবি করেন, তাকে ছাড়িয়ে নেওয়ার জন্য উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির বাবুল এবং রাজাপুর ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মিজানুর রহমান মেম্বার থানায় গিয়েছিলেন। এছাড়া অ্যাডভোকেট তাইফুর আলমও তার জামিনের ব্যবস্থা করেন বলে তিনি জানান।
স্থানীয় বাসিন্দা ও বুড়িচং উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক জামাল হোসেন চৌধুরী বলেন, “হুমায়ুন কবিরের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। তার কারণে এলাকার যুবসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউনিয়ন বিএনপির কিছু লোক তাকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে রেখেছে।”
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপির নেতারা।
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কবির হোসেন ও সাংগঠনিক সম্পাদক হুমায়ুন কবির বাবুল বলেন, “একজন মাদক কারবারি ও আওয়ামী লীগ নেতার পক্ষে আমরা সুপারিশ করব— এমন প্রশ্নই ওঠে না। সে আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছে। আমরা কখনো থানায় যাইনি।”
অ্যাডভোকেট আ হ ম তাইফুর আলম বলেন, “হুমায়ুন কবির গ্রেপ্তার হওয়ার পর তার জামিন করিয়ে দিয়েছি। তবে ‘থানাওয়ালা আইলে আমারে ফোন লাগাই দিও’— এমন বক্তব্য বা অন্য যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”
বুড়িচং থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) লুৎফুর রহমান বলেন, “কিছুদিন আগে হুমায়ুন কবিরকে গ্রেপ্তার করা হলে কোনো এক কারণে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে দুই ঘণ্টা পর আবারও গ্রেপ্তার করা হয়। একটি মামলায় তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছে। সব কথা প্রকাশ হয়ে গেলে আমাদেরও সমস্যায় পড়তে হয়।”
কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ভিপি আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম বলেন, “মাদক কারবারিদের পক্ষে সুপারিশ করা ঠিক হয়নি। অন্য মামলায় আদালতে পাঠানো হলেও মাদক মামলাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে কার্যকর থাকবে।”
এ বিষয়ে বিএনপির কুমিল্লা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া বলেন, “আমি সংসদে একটি বৈঠকে আছি। সুপারিশের বিষয়টি সঠিক হয়নি। পরে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলব।”
নিজস্ব প্রতিবেদক 

















