ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে সৌদি আরবকে ইসরায়েলের সহায়তা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাঁর দাবি, ইসরায়েল সৌদি আরবকে উল্লেখযোগ্য সহায়তা দিয়েছে। একই সঙ্গে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সম্ভাবনা আগের চেয়ে বেড়েছে বলেও মন্তব্য করেছেন তিনি। অন্যদিকে, ইয়েমেনে ক্ষেপণাস্ত্র ও বিমান হামলার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং ইরানের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) জর্জিয়ায় একটি সমাবেশে যোগ দিতে যাওয়ার আগে হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ট্রাম্প। সৌদি আরবের ইসরায়েলের সহায়তার প্রস্তাব গ্রহণ করা উচিত কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, হ্যাঁ, অবশ্যই। ইসরায়েল সৌদি আরবকে অনেক সাহায্য করেছে।
২০২০ সালে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত আব্রাহাম চুক্তিতে সৌদি আরবের যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে ট্রাম্প বলেন, তাঁর ধারণা, সেই সম্ভাবনা আগের চেয়ে বেড়েছে। আব্রাহাম চুক্তিকে নিজের প্রশাসনের অন্যতম বড় অর্জন হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সৌদি আরব ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন পেয়ে সন্তুষ্ট।
এর আগে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সৌদি আরব ইসরায়েলের কাছে সহায়তা চেয়েছে কি না। টাইমস অব ইসরায়েলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জবাবে নেতানিয়াহু বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে এমন দেশ খুব কমই রয়েছে, যারা ইসরায়েলের কাছে সহায়তা চাইছে না।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার আগে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সৌদি আরবের অবস্থান এ প্রক্রিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হয়ে রয়েছে।
রিয়াদ বরাবরই বলে আসছে, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সুস্পষ্ট পথ নিশ্চিত না হলে ইসরায়েলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। ফলে হুথিদের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সম্ভাব্য সহায়তা এবং সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ইয়েমেনের হুথি বাহিনী ও সৌদি সমর্থিত পক্ষগুলোর মধ্যে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার অভিযোগ সামনে এসেছে। ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকার শুক্রবার অভিযোগ করেছে, হুথিরা এডেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর লক্ষ্য করে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র দুটি কায়রোগামী ইয়েমেনিয়া এয়ারলাইনসের একটি বিমানের কাছে পড়ে। ওই সময় বিমানটি উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছিল বলে জানিয়েছেন দেশটির তথ্যমন্ত্রী মোয়াম্মার আল-ইরইয়ানি।
এর আগে ইয়েমেনের আল-মাশিক প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় পাঁচজন নিহত ও ১৬ জন আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দাবি করেছেন, গত ২৪ ঘণ্টায় সৌদি যুদ্ধবিমান ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় ১০১টি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তাঁর দাবি অনুযায়ী, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল রাজধানী সানাসহ দালে, তাইজ, হোদেইদা, ধামার, মারিব, সাদা, আল-জাওফ, আমরান ও লাহজ প্রদেশের বিভিন্ন স্থাপনা।
সারি আরও দাবি করেন, খামিস মুশাইত ও তায়েফের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা এফ-১৫ ও টাইফুন যুদ্ধবিমান এবং নাজরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র এসব হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে। এসব হামলায় নারী ও শিশুসহ বেসামরিক মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি। তাঁর দাবি অনুযায়ী, উত্তেজনা শুরুর পর থেকে সৌদি হামলার মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪৮৯টিতে। তবে এসব দাবির স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা যায়নি।
সৌদি আরবে নিযুক্ত মার্কিন দূতাবাস ১৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে একটি নিরাপত্তা সতর্কতা প্রকাশ করে, যা শুক্রবার সামনে আসে। সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার প্রেক্ষাপটে বিমানবন্দর লক্ষ্য করে হামলা, আকাশসীমা বন্ধ, ফ্লাইট বাতিল এবং ভ্রমণে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কায় মার্কিন নাগরিকদের সতর্ক করা হয়।
দূতাবাসের পরামর্শে বিমানবন্দর ব্যবহারের সময় বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন, সংশ্লিষ্ট বিমান সংস্থা ও বিমানবন্দর থেকে সরাসরি ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা জেনে নেওয়া এবং সৌদি বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণের কথা বলা হয়েছে।
ইয়েমেনের হুথি বাহিনীর হামলায় ইরানের সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সৌদি আরব। তবে শুক্রবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকায়ি এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো অনুরোধ করলে সংঘাত থামাতে তেহরান তার সামর্থ্য কাজে লাগাতে প্রস্তুত।
বাকায়ির বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও অবরোধ ইয়েমেন সংকটের সমাধান নয়। তিনি ইয়েমেনের সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান দেখানো, হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং আকাশ ও নৌ অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানান।
ইয়েমেনের সশস্ত্র বাহিনী নিজেদের স্বার্থেই অভিযান পরিচালনা করছে বলে দাবি করেন তিনি। একই সঙ্গে ইরান সংঘাতের বিস্তার চায় না বলেও উল্লেখ করেন দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের সংঘাত, সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং ইসরায়েলের সম্ভাব্য সহায়তা ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠেছে। তবে সৌদি আরব ইসরায়েলের সহায়তার প্রস্তাব গ্রহণ করবে কি না, কিংবা এর ফলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়া কতটা এগোবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সূত্র: পার্সটুডে
kalprakash.com/IM