ইসলামে মানুষের শারীরিক সুস্থতার পাশাপাশি আধ্যাত্মিক সুস্থতাকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমান সময়ে বিষণ্নতা (Depression), উদ্বেগ (Anxiety) ও মানসিক চাপের (Stress) অন্যতম কারণ হিসেবে তীব্র প্রতিযোগিতা, একাকিত্ব এবং প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যবহারকে বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া মাদকাসক্তি, বর্ডারলাইন পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, অ্যান্টিসোশ্যাল পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার, হিসট্রিওনিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডার এবং নার্সিসিস্টিক পার্সোনালিটি ডিসঅর্ডারের মতো মানসিক সমস্যাও মানুষের সুস্থ জীবনযাপনে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি ৪০ সেকেন্ডে কেউ না কেউ আত্মহত্যা করছেন। আত্মহত্যার পেছনে বিভিন্ন জটিল কারণ থাকতে পারে, যার মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যাও অন্যতম। এ থেকে মানসিক সুস্থতা ও প্রশান্তির গুরুত্ব উপলব্ধি করা যায়। অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অনিদ্রা কিংবা মনোযোগের অভাবের মতো সমস্যায় মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি ইসলামের আধ্যাত্মিক দিকনির্দেশনাও অনেকের জন্য সহায়ক হতে পারে।
হতাশা ও বিষণ্নতা মোকাবিলায় তাওয়াক্কুল ও তাকদির
ইসলামের দৃষ্টিতে, জীবনের ঘটনাবলির ক্ষেত্রে আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও ভরসা গুরুত্বপূর্ণ। একজন মুমিন যথাসাধ্য চেষ্টা করার পর ফলাফলের জন্য মহান আল্লাহর ওপর ভরসা রাখেন। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তার জন্য তিনিই যথেষ্ট।’ (সুরা তালাক, আয়াত: ৩)
এ ধরনের বিশ্বাস মানুষকে মানসিক শক্তি জোগাতে পারে এবং ব্যর্থতা ও প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলায় ইতিবাচক মনোভাব গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
দুশ্চিন্তা ও উদ্বেগ কমাতে সালাত ও জিকির
ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা মানুষের মনে উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। ইসলাম মানসিক প্রশান্তি অর্জনে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় এবং আল্লাহর জিকিরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৫)
নিয়মিত নামাজ ও জিকির মানুষকে আত্মসংযম, মনোযোগ এবং আধ্যাত্মিক প্রশান্তি অর্জনে সহায়তা করতে পারে। পবিত্র কোরআনে আরও বলা হয়েছে, ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই অন্তর প্রশান্ত হয়।’ (সুরা রাদ, আয়াত: ২৮)
হীনম্মন্যতা কাটাতে কৃতজ্ঞতাবোধ
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের চাকচিক্য ও অন্যের জীবনযাপনের সঙ্গে নিজের তুলনা অনেকের মধ্যে হীনম্মন্যতা ও অতৃপ্তি তৈরি করতে পারে। এ ক্ষেত্রে নিজের প্রাপ্তি ও সামর্থ্যের প্রতি মনোযোগী হওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশনা দিয়েছেন, ‘তোমরা তোমাদের চেয়ে নিম্নস্তরের লোকদের দিকে তাকাও এবং উচ্চস্তরের লোকদের দিকে তাকিয়ো না। এটিই আল্লাহর নিয়ামতকে অবজ্ঞা না করার জন্য উপযুক্ত।’ (সহিহ মুসলিম)
পাশাপাশি কৃতজ্ঞতাবোধ মানুষের সন্তুষ্টি ও মানসিক তৃপ্তি বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তবে আমি অবশ্যই তোমাদের নিয়ামত বাড়িয়ে দেব।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত: ৭)
মনের অস্থিরতা দূর করতে পবিত্র কোরআন
পবিত্র কোরআন মুমিনদের জন্য হেদায়াত, রহমত ও অন্তরের প্রশান্তির উৎস। কোরআন তিলাওয়াত, এর অর্থ অনুধাবন এবং নির্দেশনা অনুসরণের মাধ্যমে অনেকে মানসিক প্রশান্তি অনুভব করেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি কোরআনে এমন বিষয় নাজিল করেছি, যা রোগের নিরাময় এবং মুমিনদের জন্য রহমত।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮২)
অতীতের দুঃখ ও ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা অনেক সময় মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই বর্তমানের দায়িত্ব পালনে মনোযোগী হওয়া, আল্লাহর কাছে দোয়া করা এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ধৈর্য ধারণ করা গুরুত্বপূর্ণ। সুরা দুহায় মহান আল্লাহ বলেন, ‘অবশ্যই তোমার জন্য পরবর্তী সময় পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে উত্তম।’ (সুরা দুহা, আয়াত: ৪)
একাকিত্ব দূর করতে উম্মাহ ও ভ্রাতৃত্ববোধ
জনসমাগমের মধ্যেও মানুষ নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে পারে। সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কাটিয়ে উঠতে পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও সমাজের মানুষের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা জরুরি। ইসলাম পারস্পরিক সহযোগিতা, ভ্রাতৃত্ববোধ ও সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
জামাতে নামাজ আদায়, প্রতিবেশীর খোঁজখবর নেওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অভাবী মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো কার্যক্রম সামাজিক সম্প্রীতি বাড়াতে পারে। এসব উদ্যোগ একাকিত্ব মোকাবিলায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
মানসিক সমস্যা পাপ বা দুর্বল ঈমানের লক্ষণ নয়
মানসিক কষ্ট কোনো অপরাধ নয়, আবার এটি সব সময় দুর্বল ঈমানের লক্ষণও নয়। নবী-রাসুলদের জীবনেও দুঃখ, শোক ও প্রতিকূলতা এসেছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনে স্ত্রী হজরত খাদিজা (রা.) ও চাচা আবু তালেবের মৃত্যু গভীর শোকের কারণ হয়েছিল। এ সময়টি ইসলামের ইতিহাসে ‘আমুল হুজন’ বা দুঃখের বছর হিসেবে পরিচিত।
মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে আত্মসমালোচনা, তাওবা, বৈধ ও পবিত্র উপার্জন, ক্ষতিকর আসক্তি পরিহার এবং পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্ক সুদৃঢ় করাও গুরুত্বপূর্ণ। তবে আধ্যাত্মিক চর্চার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী পেশাদার চিকিৎসকের পরামর্শ ও চিকিৎসা গ্রহণ করাও জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি, যার নিরাময় তিনি সৃষ্টি করেননি।’ (সহিহ বুখারি)
মানসিক সমস্যায় করণীয়
তীব্র বিষণ্নতা বা অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। যেমন—
-
ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের পরামর্শ ও সহযোগিতা গ্রহণ।
-
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবন।
-
অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা থেরাপিস্টের সেবা গ্রহণ।
-
প্রয়োজন অনুযায়ী কাউন্সেলিং করানো।
-
ভ্রমণ, বই পড়া এবং ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়া।
পরিশেষে বলা যায়, শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা মানুষের সামগ্রিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামের আধ্যাত্মিক অনুশীলন, পারিবারিক ও সামাজিক সহযোগিতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী আধুনিক চিকিৎসাসেবার সমন্বয় মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ, কাপাসিয়া ডিগ্রি কলেজ, কাপাসিয়া, গাজীপুর।
kalprakash.com/IM