গত ৩১ আগস্ট মন্ত্রিসভায় সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো বা নবম পে-স্কেল অনুমোদন দেওয়া হয়। এরপর এক সপ্তাহের মধ্যে পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের কথা থাকলেও প্রায় তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আজ ১৯ সেপ্টেম্বরই প্রজ্ঞাপন জারি হতে পারে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নবম পে-স্কেলের প্রজ্ঞাপন প্রকাশের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়ে (বিজি প্রেস) প্রজ্ঞাপন ছাপার কাজ চলছে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংসহ প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়াও শেষ করা হয়েছে। আজ দুপুরের পর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশ হতে পারে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নতুন পে-স্কেল একসঙ্গে নয়, মোট তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন বেতন কাঠামো চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ জুলাই মাসকে কার্যকারিতার তারিখ ধরে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন পে-স্কেলের সুবিধা পাবেন। নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নে প্রায় ২৪ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে প্রায় ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা।
এক দশকের বেশি সময় পর সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন বেতন কাঠামো পেতে যাচ্ছেন। এতে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রথম থেকে ১১তম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। অর্থাৎ এসব গ্রেডে আগের তুলনায় মূল বেতন দ্বিগুণ হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করতে একটি মূল গেজেটের পাশাপাশি বিভিন্ন বাহিনী ও প্রতিষ্ঠানের জন্য পৃথক ৫ থেকে ৭টি এসআরও জারির প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বেসামরিক সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, পুলিশ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি), সশস্ত্র বাহিনী, স্বায়ত্তশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক বাস্তবায়ন আদেশ থাকবে।
গেজেট প্রকাশের পাশাপাশি সরকারি বেতন-ভাতা ব্যবস্থাপনার সফটওয়্যার ‘আইবাস++’-এ প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের কাজও চলছে। ২০১৫ সালের পে-স্কেল কার্যকরের সময় এ সফটওয়্যার ছিল না। এবার নতুন বেতন কাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়ায় আইবাস++-এ বেতন পুনর্নির্ধারণ (ফিক্সেশন) ও নতুন হিসাব কাঠামো যুক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইতিমধ্যে অবসরে যাওয়া সোয়া ৯ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারীর তথ্য এবং পেনশনের স্তর সমন্বয়ের কাজ চলছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় বিদ্যমান ২০টি গ্রেডই বহাল থাকছে। ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে ১৪২ শতাংশ বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর প্রথম গ্রেডের নির্ধারিত বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে দ্বিগুণ করে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করা হয়েছে। ফলে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন বেতনের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১:১.৭৮।
নতুন পে-স্কেল চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে। তবে সরকারি ব্যয়ভার ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মূল বেতন ২০২৬-২৭ ও ২০২৭-২৮ অর্থবছরের মধ্যে তিন ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ও ভাতা কার্যকর হবে ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে। নতুন কাঠামোয় বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন সন্তানের জন্য প্রতি মাসে ৩ হাজার টাকা প্রতিবন্ধী সন্তান ভাতা চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে। পাশাপাশি সব গ্রেডের সরকারি কর্মচারীর জন্য মোবাইল ভাতার ব্যবস্থাও থাকছে।
পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও ধাপে ধাপে সুবিধা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত রয়েছে। নিট পেনশনের ওপর ভিত্তি করে ৯ হাজার টাকা বা তার কম পেনশনধারীদের ১০০ শতাংশ, ৯ হাজার ১ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৭৫ শতাংশ, ২০ হাজার ১ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬৫ শতাংশ, ৩০ হাজার ১ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ৬০ শতাংশ এবং ৪০ হাজার ১ টাকার বেশি পেনশনধারীদের ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত নিট পেনশন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে ‘এক গ্রেড এক পেনশন’ ব্যবস্থা চালুর প্রতিশ্রুতি রয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর ফলে প্রায় ২৪ লাখ কর্মরত সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সোয়া ৯ লাখ পেনশনভোগী সরাসরি উপকৃত হবেন। এ জন্য সরকারের বছরে অতিরিক্ত ব্যয় হবে আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। গেজেট প্রকাশের পর সরকারি কর্মচারীদের নতুন স্কেলে বেতন ফিক্সেশন এবং বকেয়া পাওনা সমন্বয়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হবে।
kalprakash.com/IM