১১ দলীয় জোটের ঢাকা-চট্টগ্রাম অভিমুখী পদযাত্রায় একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে—এটি কেবল সাধারণ কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, বরং অদূর ভবিষ্যতে কী ঘটতে যাচ্ছে, তারই একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত। দীর্ঘ গাড়িবহর ও বিশাল জনসমাগমের চেয়েও বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে নেতাদের জোরালো বক্তব্য।
ফেনীর মহিপালে আয়োজিত সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান মন্তব্য করেন, তিনি নাকি ‘ফ্যাসিবাদের পদধ্বনি’ শুনতে পাচ্ছেন। অন্যদিকে এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ আরও সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে দাবি করেন, বর্তমান সরকারের পতন ঘটবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই। ফলে রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার প্রস্তুতি হিসেবে জোটের নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক শৃঙ্খলা বজায় রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
রাজনীতিতে এমন সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই নানামুখী প্রশ্নের জন্ম দেয়। একটি নির্বাচিত বা সাংবিধানিক সরকার সাধারণত নির্বাচনে পরাজিত হয়ে, সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়ে অথবা নির্ধারিত মেয়াদ শেষে বিদায় নেয়। প্রকাশ্য রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে এভাবে ‘পতনের মাস’ ঘোষণা করা গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রচলিত ভাষা নয়। ফলে ডিসেম্বরের আলটিমেটামের অন্তর্নিহিত অর্থ কী—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর আলোচনা শুরু হয়েছে।
দাবি ও পদ্ধতির প্রশ্ন: ১১ দলীয় জোটের উত্থাপিত ছয় দফা দাবির সিংহভাগই জনজীবনের বাস্তব সংকটকে কেন্দ্র করে গঠিত। গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচার, জ্বালানি সংকট নিরসন, নিত্যপণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি এবং প্রশাসনকে সম্পূর্ণভাবে দলীয় প্রভাবমুক্ত করা—এমন সব বিষয়, যা কোনো দায়িত্বশীল সরকারের পক্ষেই উপেক্ষা করা সহজ নয়। ফলে জনগণের ক্ষোভ যেমন বাস্তব, দাবিগুলোও তেমনি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।
তবে মূল প্রশ্নটি উঠছে দাবি আদায়ের গণতান্ত্রিক পদ্ধতি নিয়ে। রাজপথে প্রতিবাদ জানানো নাগরিক অধিকার এবং তা গণতন্ত্রেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী রাজপথের চাপ কি নির্বাচনের মাধ্যমে নির্ধারিত জাতীয় ম্যান্ডেটের বিকল্প হতে পারে? জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলাম যখন ইঙ্গিত দেন যে ছয় দফা দাবি যেকোনো সময় ‘এক দফায়’ রূপ নিতে পারে, কিংবা ডা. শফিকুর রহমান যখন অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত রাজপথে থাকার ঘোষণা দেন—তখন রাজনৈতিক গন্তব্য নিয়ে জনমনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। প্রশ্নটি আন্দোলনের বৈধতা নিয়ে নয়; প্রশ্ন হলো, রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই কি একটি সরকারের বিদায়ের সময়সীমা চূড়ান্ত করা যায়?
জনসমুদ্র আর ভোটের বাক্স এক নয়: ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অনুষ্ঠিত এই পদযাত্রা জোটটির সাংগঠনিক সক্ষমতা ও শক্তিপ্রদর্শনের প্রমাণ দিয়েছে। বড় জনসমাবেশ অবশ্যই রাজনৈতিক বার্তা দেয় এবং তাতে জনমতের একটি অংশের আবেগ-প্রত্যাশা প্রতিফলিত হয়। তবে ইতিহাস বলে, রাজপথের সমাবেশ কখনো ভোটের বাক্সের বিকল্প হতে পারে না।
কিলোমিটারজুড়ে মানুষের জমায়েত শক্তিপ্রদর্শনের হাতিয়ার হতে পারে, কিন্তু তা সমগ্র দেশের জনমতের নিরঙ্কুশ প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে না। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে বারবার দেখা গেছে, বিপুল জনসমাগমের শক্তিতে উদ্বুদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো একপর্যায়ে বিশ্বাস করতে শুরু করে যে তারাই পুরো জাতির একমাত্র কণ্ঠস্বর—আর এই অতিবিশ্বাসই ডেকে আনে রাজনৈতিক সংকট। ব্যালটের মাধ্যমে সরকারকে পরিবর্তন করা এবং লাগাতার রাজপথের চাপে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এই পার্থক্যের সীমারেখা মুছে গেলে গণতান্ত্রিক প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ভেঙে পড়ে, যা রূপান্তরকালীন বা ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ।
‘ফ্যাসিবাদ’ শব্দের ভার: ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের কিছু অংশ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিলে যায়; যেমন ক্ষমতাবানদের বিলাসবহুল বাসস্থান ও সাধারণ মানুষের জীবনের বিদ্যুৎ সুবিধার বৈষম্য কিংবা প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ। এসব প্রশ্ন রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রতিটি প্রশাসনিক ত্রুটি, বিতর্কিত নিয়োগ বা নীতিগত ভিন্নমতকে ঢালাওভাবে ‘ফ্যাসিবাদ’ আখ্যা দিলে পরিভাষাটির ঐতিহাসিক গুরুত্ব ক্ষুণ্ণ হয়। কর্তৃত্ববাদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় তা প্রমাণের দায়ভারও সমানভাবে বড়।
একই সঙ্গে যারা ক্ষমতাসীনদের কর্তৃত্ববাদী বলে সমালোচনা করছেন, তাঁদের কাছেও জনগণের মৌলিক একটি প্রশ্ন থাকে—ক্ষমতায় গেলে তাঁরা কি সত্যিই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করবেন, নাকি পুরোনো ক্ষমতা কাঠামোর ভেতরে শুধু মুখের বদল ঘটবে? একটি দলের গণতান্ত্রিক অঙ্গীকার মূলত তখনই সুস্পষ্ট হয়, যখন তারা ক্ষমতায় থাকে। বিরোধী দলে থেকে গণতন্ত্রের কথা বলা সহজ, কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে প্রতিষ্ঠানকে স্বাধীন রাখা কঠিনতম পরীক্ষা।
জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান: বর্তমান বিরোধী রাজনীতিতে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা চলছে। নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে রাজনীতি করার সাংবিধানিক অধিকার প্রতিটি দলেরই রয়েছে। তবে কেবল নির্বাচনে অংশ নেওয়াই গণতন্ত্রের চূড়ান্ত মাপকাঠি নয়; দীর্ঘমেয়াদি সহনশীল আচরণ ও রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার মাধ্যমেই গণতান্ত্রিক বৈধতা অর্জন করতে হয়। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে দলটির ভূমিকা এবং পরবর্তীতে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নেতাদের বিচার ও দণ্ডাদেশ দেশের ইতিহাসের অত্যন্ত সংবেদনশীল অধ্যায়। এই ইতিহাস কোনো দলকে স্থায়ীভাবে রাজনীতির বাইরে রাখার যুক্তি হতে পারে না, তবে তা দলটির কাঁধে বাড়তি রাজনৈতিক দায়ভার চাপিয়ে দেয়। জামায়াত যদি নিজেদের গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ধারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, তবে প্রমাণ করতে হবে যে রাষ্ট্রক্ষমতা তাদের কাছে নিছক দলীয় আধিপত্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যম নয়।
এনসিপির দ্বিধাদ্বন্দ্ব: জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপির অবস্থান আরও বেশি পর্যবেক্ষণমূলক। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এই দল শুরু থেকেই প্রচলিত ধারার রাজনীতির বিকল্প হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল। তাদের রাজনৈতিক দর্শনে ছিল পরিবারতন্ত্রের অবসান, তোষণনীতির বিরোধিতা এবং বিজয়ী দলের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের সংস্কৃতির মূলোৎপাটন। কিন্তু সেই দলটিই যখন জামায়াতসহ অন্যান্য দলের সঙ্গে বৃহত্তর রাজনৈতিক জোটে শামিল হয়, তখন জনমনে প্রশ্ন জাগে। রাজনীতিতে কৌশলগত সমঝোতা অনিবার্য হতে পারে; কিন্তু পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলের ডাক দেওয়া শক্তি যদি শেষ পর্যন্ত একই ধরনের ক্ষমতা সমীকরণ ও রাজপথের চাপে আবদ্ধ হয়, তবে তাদের স্বাতন্ত্র্য কোথায় থাকে—সেই উত্তর হয়তো সময়ই দেবে।
বাইরের প্রভাবের আশঙ্কা: দেশের সার্বিক রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতিও সামনে আসছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় ইসলামিস্ট পার্টি পাসের (পিএএস) সভাপতি আবদুল হাদি আওয়াংয়ের এক বক্তব্যে অতীতে বিদেশি শক্তি কর্তৃক সরকার অস্থিতিশীল করার কথিত প্রচেষ্টার বিষয়টি নতুন করে সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশের ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিয়েও নানা আন্তর্জাতিক জল্পনা-কল্পনা ছিল। বিভিন্ন মহল থেকে হস্তক্ষেপের অভিযোগ তোলা হলেও আন্তর্জাতিক পক্ষগুলো তা নাকচ করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, যেকোনো দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে বিদেশি প্রভাব সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকাই সবচেয়ে নিরাপদ; জাতীয় রাজনীতির পথরেখা জাতীয়ভাবেই নির্ধারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়।
ডিসেম্বরের অপেক্ষা: ডিসেম্বর মাসে সত্যিই কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটবে কি না, তা ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে। অলি আহমদের ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে রূপ নেবে, নাকি তা বাংলাদেশের রাজনীতির বহু অপূর্ণ ঘোষণার তালিকায় যুক্ত হবে—তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো রাজনৈতিক পদ্ধতির শুদ্ধতা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিরোধী দল নির্বাচনে বিজয়ী হতে পারে, সরকার ক্ষমতা হারাতে পারে—এটি স্বাভাবিক নিয়ম। কিন্তু নির্বাচনের আগেই রাজপথে ফলাফল নির্ধারিত হয়ে যাওয়া এবং ভোট কেবল আনুষ্ঠানিকতায় পর্যবসিত হওয়া কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক লক্ষণ নয়। সে ক্ষেত্রে মূল প্রশ্নটি ডিসেম্বরের দিনক্ষণ নয়; বরং ক্ষমতার পরিবর্তনের পথটি ব্যালট বাক্স নির্ধারণ করবে, নাকি রাজপথের সংঘাত—সেটাই এখন দেখার বিষয়।
kalprakash.com/IM