বুধবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৬ | ১০ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১২ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | সকাল ১০:৪০:০৫

৮ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে খরচ ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা, ভর্তুকি ৫১ হাজার কোটি

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ১২:২৫
শেয়ার: mail
৮ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে খরচ ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা, ভর্তুকি ৫১ হাজার কোটি

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

ডলার সংকটে দেশের অর্থনীতির প্রায় সব খাত যখন চাপে, তখন বিপুল অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হচ্ছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পেছনে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত আট অর্থবছরে শুধু এলএনজি আমদানিতেই ব্যয় হয়েছে ২২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন (২ হাজার ২৬৫ কোটি) মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ২ লাখ ৭৭ হাজার ৪৫২ কোটি টাকা। একই সময়ে এ খাতে সরকারকে ভর্তুকি হিসেবে গুনতে হয়েছে ৫১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা।

অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচের কারণে দেশের রিজার্ভের ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকারকে প্রতিবছরই বিশাল অঙ্কের ভর্তুকির বোঝা বহন করতে হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির মূল্যবৃদ্ধির কারণে এই চাপ আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

দেশীয় গ্যাস উৎপাদন হ্রাস ও আমদানিনির্ভরতা পেট্রোবাংলার তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত ছয় বছরে দেশীয় গ্যাসের দৈনিক সরবরাহ ২ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে এসেছে। অথচ এ সময়ে বিদ্যুৎ, সার ও শিল্প খাতে গ্যাসের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বেড়েছে। দেশীয় উৎপাদন কমে যাওয়ায় সেই ঘাটতি মেটাতে সরকার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি ও খোলা বাজার (স্পট মার্কেট) থেকে নিয়মিত এলএনজি আমদানি করছে। তবে দেশীয় গ্যাসের তুলনায় আমদানি করা এলএনজি কয়েক গুণ ব্যয়বহুল হওয়ায় গ্যাস সরবরাহের সার্বিক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে।

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা প্রায় ৪ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু জাতীয় গ্রিডে দৈনিক সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র প্রায় ২ হাজার ৬৮৬ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৩৭ মিলিয়ন ঘনফুট আসছে এলএনজি থেকে, যা মোট সরবরাহের প্রায় ৩৯ শতাংশ। ফলে বিপুল অর্থ ব্যয় ও ভর্তুকি দেওয়ার পরও প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। এর প্রভাবে শিল্প কারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও আবাসিক খাতে জ্বালানি সংকট স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানো না গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্যাসের চাহিদার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে।

এলএনজি কোনো স্থায়ী সমাধান নয়: বিশেষজ্ঞ মতামত জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এলএনজি স্বল্প ও মধ্যমেয়াদে জরুরি ঘাটতি মেটানোর উপায় হলেও দীর্ঘমেয়াদে কোনো টেকসই সমাধান নয়। দেশীয় উৎপাদন বাড়ানো না গেলে ভবিষ্যতে এলএনজি আমদানির ব্যয় আরও বহুগুণ বাড়বে। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হ্রাস পাবে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘এলএনজি আমদানির পেছনে যে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, তার মাত্র ১০ ভাগের ১ ভাগ অর্থও যদি দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নতুন কূপ খননে বিনিয়োগ করা হতো, তাহলে আজ দেশকে এতটা আমদানিনির্ভর হতে হতো না।’ তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়ায় জ্বালানি খাতে ব্যয় ক্রমাগত বেড়েছে। এখন এলএনজি আমদানির একটি অংশও যদি নতুন প্রযুক্তি ও নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারে ব্যয় করা যায়, তবে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সুসংহত হবে।’

অন্যদিকে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বলেন, ‘দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। কিন্তু দেশে বিদ্যমান এলএনজি টার্মিনালের দৈনিক সক্ষমতা ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট, যা প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। নতুন টার্মিনাল স্থাপন এবং দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে বড় ধরনের সাফল্য না এলে আগামী দুই থেকে তিন বছরে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে। কেবল এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।’

পেট্রোবাংলার বক্তব্য ও নতুন কূপ খনন উদ্যোগ পেট্রোবাংলার পরিচালক (অর্থ) এ কে এম মিজানুর রহমান জানান, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়ায় ঘাটতি পূরণে এলএনজি আমদানি বাড়াতে হচ্ছে। গত অর্থবছরে ১১৩টি এলএনজি কার্গো আমদানি করা হয়েছিল এবং চলতি অর্থবছরে ১১৫টি কার্গো আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আরেকটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) চালু হলে আমদানির সক্ষমতা আরও বাড়বে।

তিনি আরও বলেন, ‘এফএসআরইউ চালু হলে যাতে পাইপলাইনের সীমাবদ্ধতায় সমস্যা না হয়, সেজন্য গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থায়নে ফেনী থেকে বাখরাবাদ পর্যন্ত প্রায় ৯০ কিলোমিটার পাইপলাইন নির্মাণের প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা চলছে।’

দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘পেট্রোবাংলা এরই মধ্যে ১৫০টি কূপ খননকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি সাগরে (অফশোরে) তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য গত ২৪ মে বিডিং রাউন্ড আহ্বান করা হয়েছে এবং ১ জুন থেকে দরপত্র বিক্রি শুরু হয়েছে। আগামী ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত দরপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ থাকবে।’

অর্থবছরভিত্তিক এলএনজি আমদানি ও ভর্তুকির চিত্র পেট্রোবাংলা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে দেশে প্রথম বাণিজ্যিকভাবে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। বিগত অর্থবছরগুলোতে আমদানি ব্যয় ও ভর্তুকির চিত্র:

  • ২০১৮-১৯ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ১১,৮১৩ কোটি টাকা, ভর্তুকি ২,৫০০ কোটি টাকা (আমদানি ৪১ কার্গো)।

  • ২০১৯-২০ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ১৭,৫০৩ কোটি টাকা, ভর্তুকি ৩,৫০০ কোটি টাকা।

  • ২০২০-২১ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ১৬,৫০৬ কোটি টাকা, ভর্তুকি ৩,৪৯৮ কোটি টাকা।

  • ২০২১-২২ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ৪০,৫৬৩ কোটি টাকা, ভর্তুকি ৬,০০০ কোটি টাকা।

  • ২০২২-২৩ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ৩৫,২৭৫ কোটি টাকা, ভর্তুকি ৬,৩৩২ কোটি টাকা।

  • ২০২৩-২৪ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ৪২,৮৪৫ কোটি টাকা, ভর্তুকি ৬,০৩৬ কোটি টাকা।

  • ২০২৪-২৫ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ৫৩,৯৪৭ কোটি টাকা, ভর্তুকি ৮,৯০০ কোটি টাকা।

  • ২০২৫-২৬ অর্থবছর: আমদানি ব্যয় ৫৯,০০০ কোটি টাকা, ভর্তুকি ১৪,৬০০ কোটি টাকা (আমদানি ১১৩ কার্গো, যার মধ্যে ৫০টি স্পট মার্কেট থেকে)।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এলএনজি খাতে বাজেটে ভর্তুকি হিসেবে বরাদ্দ ছিল ৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে দরবৃদ্ধি ও স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে কেনায় প্রকৃত ভর্তুকি দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকায়, যা মূল বরাদ্দের দ্বিগুণেরও বেশি।

জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা সময়সাপেক্ষ। ফলে বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত চালু রাখতে অন্তর্বর্তী সময়ে এলএনজি আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো ছাড়া বিকল্প কোনো পথ নেই।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

৮ অর্থবছরে এলএনজি আমদানিতে খরচ ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা, ভর্তুকি ৫১ হাজার কোটি

বিস্তারিত কমেন্টে