রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬ | ৭ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ৯ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | বিকাল ৫:০৪:২২

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট: অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে জরুরি সমাধানের তাগিদ

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: রবিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৬, ৩:৫২
শেয়ার: mail
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট: অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে জরুরি সমাধানের তাগিদ

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

জনজীবন এখন প্রচণ্ড সমস্যাসংকুল। বাসাবাড়িতে গ্যাস থাকে না বহুদিন। কেউ ইলেকট্রিক চুলায় রান্না করছেন, কেউবা লাকড়ির চুলায়। আর যারা অত্যন্ত ব্যস্ত, তারা এখন হোটেল-রেস্তোরাঁর খাবারের ওপর নির্ভরশীল। এ রকম পরিস্থিতিতে দু-চার দিন কাটানো গেলেও মাসের পর মাস চলা অসম্ভব। ফলে সাধারণ মানুষের কষ্ট ক্রমান্বয়ে তীব্র ক্ষোভে রূপ নিচ্ছে। গ্যাস সংকটে মানুষ যখন দিশেহারা, তখন ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে এসেছে লোডশেডিং। মফস্বল ও গ্রামাঞ্চলে এখন দৈনিক ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। মানুষ ক্ষোভের সাথে বলছে—বিদ্যুৎ যায় না, মাঝেমধ্যে আসে। তীব্র গরম আর লোডশেডিংয়ে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে; বিদ্যুৎ না থাকায় বাসাবাড়িতে পানির সংকটও তীব্র হচ্ছে।

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট শুধু বাসাবাড়ির দুর্ভোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ঘরে ঘরে যা দেখা যাচ্ছে, তা সংকটের উপরিভাগ মাত্র। এই সমস্যা গোটা দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানার উৎপাদন মুখ থুবড়ে পড়েছে। ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কারখানাগুলো অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে। বহু কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলে উদ্যোক্তারা কীভাবে শ্রমিকদের বেতন ও ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করবেন? ফলে বেতন না পেয়ে শ্রমিকরা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন এবং উদ্যোক্তারা ঋণখেলাপি হচ্ছেন। এর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সামগ্রিক আর্থিক খাতের ওপর। দেশের বেশিরভাগ ব্যাংক ইতোমধ্যেই তারল্য সংকটে রয়েছে; ঋণ আদায় ব্যাহত হওয়ায় আর্থিক খাতের অবস্থা আরও নাজুক হয়ে পড়ছে। ফলে বাংলাদেশ এক অর্থনৈতিক সংকটের দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়ছে।

অর্থনীতিতে উৎপাদনশীলতার ঘাটতি তৈরি হলে তা বহুমাত্রিক সমস্যা ডেকে আনে। এর ফলে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, হু হু করে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম এবং রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানের স্বাভাবিক নিয়ম অনুযায়ী, অর্থনৈতিক সংকট যত গভীর হয়, সামাজিক অস্থিরতা ও অপরাধপ্রবণতা ততই বাড়ে। এর ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে এবং চাঁদাবাজি, ছিনতাই, ডাকাতি ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। সাম্প্রতিক চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও অর্থনৈতিক সংকটের কারণে তা আবার অবনতির দিকে যাচ্ছে। বাড়ছে পারিবারিক সহিংসতা ও গৃহবিবাদ।

একই সঙ্গে অর্থনৈতিক সংকট, সামাজিক বিশৃঙ্খলা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বড় ধরনের রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি করে। জনগণের হতাশা ও ক্ষোভকে পুঁজি করে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং রাজনৈতিক পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে তৃতীয় কোনো অগণতান্ত্রিক শক্তি সুযোগ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা দেশকে অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

বর্তমান সরকারের বয়স ছয় মাস অতিক্রম করেছে। ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দায়িত্ব নেওয়ার পর পূর্ববর্তী আমলের অব্যবস্থাপনা, আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি এবং আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে সরকার জ্বালানি সংকটে পড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে অতীতের দুর্নীতি ও লুটপাটের কথা বলা হলেও সাধারণ মানুষ এখন আর কোনো অজুহাত শুনতে চায় না। গরমে ও অন্ধকারে ভোগান্তির শিকার সাধারণ মানুষের কাছে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস পাওয়াটাই প্রধান চাওয়া। মানুষ এখন কৈফিয়ত নয়, বাস্তব সমাধান চায়।

যেকোনো সরকারের প্রথম ছয় মাসকে পর্যবেক্ষণের সময় ধরা হলেও সেই সময়সীমা শেষ হয়েছে। এখন সরকারের মূল দায়িত্ব হলো দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের সমাধান করা, অর্থনীতির চাকা সচল রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটানো।

সংকট উত্তরণে আশু করণীয়: ১. আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিরসন করে বিদ্যুৎ বিতরণব্যবস্থা ও জ্বালানি সরবরাহ ধাপে ধাপে বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া। ২. আঞ্চলিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে জ্বালানি কূটনীতি জোরদার করে গ্যাস ও জ্বালানি তেল আমদানির কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। ৩. বাসাবাড়িতে পাইপলাইনের প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করে সেই গ্যাস শিল্প-কারখানার উৎপাদনে সরবরাহ করা। ৪. সিএনজিচালিত যানবাহনকে দ্রুত বিকল্প জ্বালানি বা প্রযুক্তিতে রূপান্তর করার উদ্যোগ গ্রহণ করা। ৫. সৌরবিদ্যুৎসহ নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো। ৬. দেশে বৈদ্যুতিক গাড়ির (EV) ব্যবহার বাড়াতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও আইনি সহায়তা নিশ্চিত করা। ৭. রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত চালু করে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।

এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব গ্যাসকূপ খনন ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করতে হবে। দেশের মানুষ এখন সংকট থেকে মুক্তি এবং দ্রুত কার্যকর সমাধান প্রত্যাশা করছে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
রোববার, ২৩ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট: অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধে জরুরি সমাধানের তাগিদ

বিস্তারিত কমেন্টে