ঘরে ফেরার বিন্দুমাত্র সামর্থ্য নেই, নেই মাথা গোঁজার একটি নিরাপদ আশ্রয়ও। অবুঝ দুই সন্তানকে সাথে নিয়ে রোদ-বৃষ্টির মুখোমুখি খোলা আকাশের নিচে অতি কষ্টে দিন কাটছে বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার সন্তোষপুর গ্রামের রেহানা খাতুনের। অভাবের নির্মম তাড়নায় ঘরভাড়া পরিশোধ করতে একসময় নিজের মাথার চুল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছিল নিঃস্ব এই মা’কে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, রেহানা পূর্বে একটি সামান্য ঝুপড়ি ঘর ভাড়া নিয়ে সন্তান দুটোকে কোলে চেপে জীবন ধারণ করতেন। তবে অভাবের কারণে দীর্ঘদিন ঘরের ভাড়া বকেয়া পড়ায় সেই শেষ আশ্রয়টুকুও হারাতে হয় তাঁকে। বর্তমানে বাধ্য হয়ে খুলনা-মোংলা রেললাইনের পাশে সরকারি খাস জায়গায় খোলা আকাশের নিচে দুটি নিষ্পাপ সন্তানকে নিয়ে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন তিনি।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, রেলব্রিজ সংলগ্ন এলাকায় বাঁশের খুঁটি পুঁতে একটি ঘরের প্রাথমিক কাঠামো দাঁড় করানো হয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেশীদের সামান্য সহযোগিতায় রেহানা এই বাঁশের বেষ্টনীটুকু তুলতে পারলেও অর্থের চরম সংকটে বেড়া ও চালের কাজ শেষ করতে পারছেন না। ফলে টানা কয়েক মাস ধরে শুধু বাঁশের সেই জরাজীর্ণ কঙ্কালটিই দাঁড়িয়ে আছে। টিন ও ছাউনি না থাকায় কড়া রোদ এবং মুষলধারার বৃষ্টির মধ্যেই ভিজে একাকার হতে হচ্ছে মা ও দুই সন্তানকে।
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে স্থানীয় প্রতিবেশী ফেরদৌসী বেগম জানান, আশ্রয়ের চরম সংকটে রেহানা কিছুদিন তাঁদের বাড়ির একপাশে অস্থায়ীভাবে আশ্রয় নিয়েছিলেন। একদিন তাঁর মাথার পুরো চুল কাটা দেখে কারণ জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়ে রেহানা জানান— ঘরের মাত্র ৫০০ টাকা বকেয়া ভাড়া মেটাতে এক চুল ব্যবসায়ীর কাছে বাধ্য হয়ে নিজের মাথার চুল বিক্রি করে দিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে রামপালের বয়োবৃদ্ধ স্থানীয় বাসিন্দা আবু তালেব শেখ উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “মেয়েটির অবস্থা চোখে দেখা যায় না। শিশু দুটোর মুখের দিকে তাকালে মায়া লাগে। আমরা চাই সরকার দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অসহায় পরিবারের স্থায়ী নিবাসের ব্যবস্থা করুক।”
স্থানীয় মহিদুল ইসলাম নামের আরেক বাসিন্দা জানান, বাঁশের পুরো কাঠামোটি রেডি আছে। সামান্য টিন ও বেড়ার টিন জোগাড় করা গেলে ঘরটি থাকার উপযোগী করা সম্ভব। সমাজের দানশীল ব্যক্তিরা এগিয়ে এলে অন্তত পরিবারটি একটি থাকার মাথা পাবে।
অসহায় রেহানা খাতুন আকুতি জানিয়ে বলেন, “দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে ভীষণ কষ্টে দিন কাটছে। থাকার ভালো ঘর নেই, তিন বেলা খাবারের কোনো নিশ্চয়তা নেই। বাধ্য হয়ে মাথার চুল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়েছে। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাকে ছোট একটি মাথা গোঁজার ঘর দিয়ে সাহায্য করুন।”
দুটি অবুঝ শিশুর অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রতি মুহূর্তে দুশ্চিন্তায় দিন কাটানো রেহানার স্বপ্ন খুব বেশি বড় নয়— কেবল একটি ছোট্ট মাথা গোঁজার ঠাঁই, যেখানে সন্তানদের নিয়ে অন্তত নিরাপদে রাতটুকু ঘুমাতে পারবেন তিনি। স্থানীয়রা সরকারি আবাসন ও আশ্রয়ন প্রকল্পের আওতায় দ্রুততম সময়ে এই নিঃস্ব পরিবারটিকে পুনর্বাসনের জোর দাবি জানিয়েছেন।
kalprakash.com/IM