সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬ | ১৮ শ্রাবণ, ১৪৩৩ | ১৮ সফর, ১৪৪৮ | রাত ১০:৩৭:০৪

রংপুরে সিসা দূষণবিরোধী র‍্যালি, শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি

কাল প্রকাশ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ২:৪৫
শেয়ার: mail
রংপুরে সিসা দূষণবিরোধী র‍্যালি, শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর নজরদারির দাবি

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

শিশুদের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সিসা দূষণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবিতে রংপুরে সচেতনতামূলক র‍্যালি ও প্রচারণা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে। আয়োজকদের মতে, অপরিকল্পিত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন উৎস থেকে ছড়িয়ে পড়া সিসা দূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠছে।

শুক্রবার (১৭ জুলাই) সকালে সিসা দূষণ বন্ধ করি, সুস্বাস্থ্য ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করি প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে নগরীর চন্দ্রার মোড় থেকে র‍্যালির আয়োজন করে স্বেচ্ছাসেবী ও পরিবেশবাদী সংগঠন ইয়ুথনেট গ্লোবাল। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা পিওর আর্থের সহযোগিতায় আয়োজিত এ কর্মসূচি দেশের আটটি বিভাগে চলমান সপ্তাহব্যাপী সচেতনতামূলক কার্যক্রমের অংশ।

র‍্যালিটি আবু সাঈদ চত্বরসহ নগরীর প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে গিয়ে শেষ হয়। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, পরিবেশকর্মী, সরকারি প্রতিনিধি ও তরুণসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার অর্ধশতাধিক মানুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীরা সিসা দূষণবিরোধী বিভিন্ন স্লোগানসংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার প্রদর্শন করেন।

কর্মসূচিতে সিসা বিষক্রিয়া প্রতিরোধে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে সিসাকে বিষাক্ত রাসায়নিক দ্রব্য হিসেবে ঘোষণা করে জাতীয় কৌশল প্রণয়ন, শিশু ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর রক্তে সিসার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা, অবৈধ সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বন্ধে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) কার্যকর করা, ব্যবহৃত ব্যাটারির নিরাপদ সংগ্রহ ও পরিবেশবান্ধব পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ নিশ্চিত করা এবং সিসা দূষণবিষয়ক গবেষণা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।

আয়োজকরা বলেন, অনিয়ন্ত্রিত ব্যাটারি ভাঙা ও পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণের ফলে মাটি, পানি ও বাতাসে সিসা ছড়িয়ে পড়ছে, যা শ্রমিক, শিশু এবং আশপাশের মানুষের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের নির্বাহী সমন্বয়ক সোহানুর রহমান বলেন, অপরিকল্পিত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ শুধু শ্রমিক নয়, আশপাশের পুরো জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। এ সমস্যা মোকাবিলায় তরুণদের সম্পৃক্ততা, স্থানীয় সচেতনতা বৃদ্ধি এবং কার্যকর নীতিমালা বাস্তবায়ন জরুরি।

সংগঠনের পরিবেশগত সুবিচার ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক সমন্বয়ক মোহাইমিনুল ইসলাম জিপাত বলেন, সিসা দূষণ প্রতিরোধ শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়; এটি সমাজের প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত দায়িত্ব। শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সিসামুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং তরুণদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ড. আবু রেজা মো. তৌফিকুল ইসলাম বলেন, সিসা দূষণ একটি নীরব বিষ, যা ধীরে ধীরে পরিবেশ ও মানবস্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। সচেতনতা ও প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপই আমাদের পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এই অদৃশ্য হুমকি থেকে রক্ষা করতে পারে।

পিওর আর্থ বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর মিতালী দাশ বলেন, শিশুদের খেলনা থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় রান্নার বাসনপত্রসহ বিভিন্ন পণ্যে বিষাক্ত সিসার উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। তাই সরকারি পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, ব্যবহৃত সিসা অ্যাসিড ব্যাটারির নিরাপদ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ এবং ব্যাপক জনসচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।

ইয়ুথনেট গ্লোবালের রংপুর বিভাগীয় সমন্বয়কারী জিলহাজ সরকার বলেন, শিশুদের নিরাপদ শৈশব নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক নজরদারি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। সিসা দূষণ শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি শিশুদের অধিকার, জনস্বাস্থ্য এবং সুবিচারের প্রশ্ন।

সলিউশন বাংলাদেশের সদস্য সোহাগ কুমার বলেন, সিসা দূষণ শিশুদের মেধা বিকাশ, স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যতের জন্য বড় হুমকি। সরকার, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। কোনো শিশুর ভবিষ্যৎ বিষাক্ত দূষণের কাছে জিম্মি হতে পারে না।

এ সময় বক্তারা জানান, সিসা দূষণে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুর সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে চতুর্থ। দেশে সাড়ে তিন কোটির বেশি শিশুর রক্তে উদ্বেগজনক মাত্রায় সিসা রয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও সংশ্লিষ্ট গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ শিশুর রক্তে সিসার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বেশি। বিভাগভিত্তিক তথ্যে ঢাকায় ৬৫ শতাংশ, সিলেটে ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ শিশুর রক্তে উচ্চমাত্রার সিসা শনাক্ত হয়েছে।

রংপুর জেলা প্রতিনিধি মো. মাইদুল ইসলাম মাহিদ বলেন, সিসা কোনো সাধারণ ময়লা নয়, এটি একটি নীরব ঘাতক, যা আমাদের অজান্তেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিবেশকে সিসামুক্ত রাখতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward