বয়স যাই হোক না কেন, মাতৃত্বের পরিকল্পনা করার আগে শরীরকে সম্পূর্ণভাবে প্রস্তুত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গর্ভধারণের আগে হবু মায়ের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে রক্তের সাধারণ পরীক্ষা থেকে শুরু করে বংশগত রোগের পরীক্ষা—কোন কোন পরীক্ষা করানো প্রয়োজন, সে বিষয়ে নির্দেশিকা প্রকাশ করেছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)।
চিকিৎসকদের মতে, শরীরে কোনো রোগ লুকিয়ে আছে কি না, তা না জেনে মাতৃত্বের সিদ্ধান্ত নিলে মা ও গর্ভস্থ শিশু—উভয়ের জন্যই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে জিনগত রোগের প্রকোপ বিবেচনায় সন্তান নেওয়ার আগে জেনেটিক স্ক্রিনিং বা জিনগত পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বংশগত রোগ বা যৌনবাহিত সংক্রমণ আছে কি না, তাও পরীক্ষা করা জরুরি।
সাধারণভাবে মা হওয়ার আদর্শ বয়স ২১ থেকে ৩০ বছর ধরা হলেও বর্তমানে অনেক নারী ক্যারিয়ারের কারণে দেরিতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। এ ক্ষেত্রে জরায়ু সন্তানধারণের উপযোগী কি না এবং মা শারীরিকভাবে প্রস্তুত কি না, তা যাচাই করা প্রয়োজন। অন্যথায় গর্ভপাত বা গর্ভস্থ ভ্রূণের জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
আইসিএমআরের নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষাগুলো হলো—
১. হরমোন ও ডায়াবেটিস পরীক্ষা
থাইরয়েড পরীক্ষা (T3, T4 ও TSH): হাইপোথাইরয়েডিজম থাকলে সন্তানধারণে সমস্যা হতে পারে এবং গর্ভপাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
রক্তে শর্করার মাত্রা (HbA1c ও Fasting Blood Sugar): রক্তে শর্করার মাত্রা বেশি থাকলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ে। অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস গর্ভস্থ শিশুর জন্মগত ত্রুটির কারণ হতে পারে।
২. রক্তের সাধারণ ও বংশগত রোগের পরীক্ষা
থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং: মা ও বাবা উভয়েই যদি থ্যালাসেমিয়ার বাহক হন, তাহলে সন্তানের থ্যালাসেমিয়া মেজর হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই গর্ভধারণের আগেই এই পরীক্ষা করানো জরুরি।
সিবিসি (CBC) ও ব্লাড গ্রুপ: সিবিসি পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তস্বল্পতা বা অ্যানিমিয়া আছে কি না জানা যায়। পাশাপাশি মায়ের রক্তের গ্রুপ নেগেটিভ এবং বাবার পজিটিভ হলে গর্ভাবস্থায় বিশেষ চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে।
৩. সংক্রামক রোগের পরীক্ষা
টর্চ (TORCH) প্যানেল: রুবেলা, সিফিলিস, ভ্যারিসেলা-জোস্টার, হার্পিস সিমপ্লেক্স এবং সাইটোমেগালোভাইরাসের মতো সংক্রমণ শনাক্ত করতে এই পরীক্ষা করা হয়।
এইচআইভি ও হেপাটাইটিস বি এবং সি পরীক্ষা: মায়ের শরীরে এসব ভাইরাস থাকলে তা সন্তানের শরীরেও সংক্রমিত হতে পারে। তাই আগে থেকেই পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
৪. প্রজনন ও পুষ্টিগত পরীক্ষা
পেলভিক আল্ট্রাসাউন্ড: জরায়ু ও ডিম্বাশয়ের গঠনগত সমস্যা, সিস্ট, ফাইব্রয়েড বা পলিসিস্টিক ওভারি ডিজিজ (পিসিওডি) আছে কি না, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়।
ভিটামিন ডি ও ভিটামিন বি১২ পরীক্ষা: ভিটামিন ডি-এর ঘাটতি শিশুর হাড়ের গঠনে প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৫. জেনেটিক স্ক্রিনিং বা জিনগত পরীক্ষা
এনআইপিটি (NIPT): মায়ের বয়স ৩৫ বছরের বেশি হলে এই পরীক্ষা করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এটি গর্ভস্থ শিশুর ডাউন সিনড্রোমের ঝুঁকি মূল্যায়নে সহায়তা করে।
প্রি-ইমপ্লান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং (PGT): ভ্রূণের ক্রোমোজোমে কোনো ত্রুটি আছে কি না অথবা গুরুতর জিনগত রোগের ঝুঁকি রয়েছে কি না, তা এই পরীক্ষার মাধ্যমে নির্ণয় করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুস্থ মা ও সুস্থ শিশুর জন্য সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনার অন্তত কয়েক মাস আগে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। পাশাপাশি সুষম খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, প্রয়োজনীয় টিকা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলিক অ্যাসিড গ্রহণও গর্ভধারণের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সূত্র: ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ (আইসিএমআর)
kalprakash.com/IM