মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬ | ১৯ শ্রাবণ, ১৪৩৩ | ১৯ সফর, ১৪৪৮ | ভোর ৪:৪৯:৫৯

দায়িত্বশীলদের অবহেলায় থামছেই না নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণশ্রমিকদের মৃত্যুর মিছিল

কাল প্রকাশ
প্রকাশ: শুক্রবার, ১৭ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫৭
শেয়ার: mail
দায়িত্বশীলদের অবহেলায় থামছেই না নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণশ্রমিকদের মৃত্যুর মিছিল

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাঠামোগত মানদণ্ডে বিশ্ববিদ্যালয়কে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ জ্ঞান উৎপাদন ও বিতরণের এই বিদ্যাপীঠে যেসব নির্মাণশ্রমিকের অক্লান্ত পরিশ্রমে একের পর এক বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে, তাঁদের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্মাণাধীন বিভিন্ন ভবনে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই শ্রমিকদের কাজ করার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে সেখানে একাধিক নির্মাণশ্রমিক আহত ও নিহত হয়েছেন।

গত মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন ১০ তলা ইউটিলিটি ভবন-৪-এ স্যানিটারি কাজ করার সময় নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন নির্মাণশ্রমিক রাসেল। সহকর্মীরা তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাম্বুলেন্সে করে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেল ৩টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। নিহত রাসেলের বাড়ি চাঁদপুর জেলায়।

এর আগে গত বছরের ২২ মার্চ নির্মাণাধীন একটি ১০ তলা ভবন থেকে পড়ে মারা যান রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসিন্দা নির্মাণশ্রমিক মো. ইব্রাহিম। সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রোজা অবস্থায় কাজ শেষে নিচে নামার সময় ভবনের ফাঁকা অংশের পাশে দাঁড়ালে মাথা ঘুরে নিচে পড়ে যান তিনি। পরে ত্রিশাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। সে সময় শ্রমিকরা অভিযোগ করেছিলেন, বারবার দাবি জানানো সত্ত্বেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করেনি।

এরও আগে ২০১৯ সালের ১৫ মে নির্মাণাধীন তৎকালীন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্র হলের ১০ তলা ভবনের অষ্টম তলায় কাজ করার সময় নিচে পড়ে মারা যান ২০ বছর বয়সী নির্মাণশ্রমিক হাসান। গুরুতর আহত অবস্থায় তাঁকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়। ওই ঘটনাতেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল।

শুধু মৃত্যুই নয়, ২০২৫ সালের ৩১ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্মাণাধীন একটি ছাত্র হলের বারান্দার ছাদ ধসে অন্তত ১০ নির্মাণশ্রমিক আহত হন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ ছিল, ঢালাইয়ের সময় দুর্বল সাপোর্ট ব্যবহার করায় ছাদটি ধসে পড়তে পারে। ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করলেও সেই তদন্তের প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, তাও স্পষ্ট নয়। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আবারও প্রাণহানির ঘটনা ঘটায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনার পর প্রতিবারই তদন্তের ঘোষণা দেওয়া হলেও নির্মাণশ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, নিরাপত্তা সরঞ্জামের বাধ্যতামূলক ব্যবহার এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে অভিযোগ রয়েছে।

বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নির্মাণস্থলে শ্রমিকদের জন্য হেলমেট, সেফটি বুট, গ্লাভস, গগলস ও মাস্ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক। এছাড়া দুই মিটারের বেশি উচ্চতায় কাজের ক্ষেত্রে সুরক্ষা বেল্ট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মাচা নির্মাণে পর্যাপ্ত ও মজবুত উপকরণ ব্যবহার, নিয়মিত পরিদর্শন এবং উন্মুক্ত ছাদ, লিফট ও সিঁড়ির পাশে নিরাপত্তা রেলিং ও সতর্কতামূলক জাল স্থাপনের নির্দেশনাও রয়েছে। আইনে কর্মস্থলে দুর্ঘটনা ঘটলে মালিকপক্ষকে শ্রমিকের চিকিৎসা ব্যয় ও ক্ষতিপূরণ বহনের বাধ্যবাধকতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

সম্প্রতি শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার পর নির্মাণাধীন ইউটিলিটি ভবন-৪-এর নির্মাতা প্রতিষ্ঠান খান অ্যান্ড সন্স বিডি লিমিটেডের প্রকৌশলী জসিম বলেন, নিহত শ্রমিককে কাজে যাওয়ার আগে সেফটি বেল্ট দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে থাকা সহকারী শ্রমিককেও সেফটি বেল্ট দেওয়া হয়। কিন্তু নিহত শ্রমিক নিজে সেটি ব্যবহার করেননি এবং তাঁর সহকারীকে বলেন, সেফটি বেল্ট পরার প্রয়োজন নেই।

এ বিষয়ে জানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. মো. মাহবুবুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, শ্রমিক মৃত্যুর বিষয়টি প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলামের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

পরে প্রকল্প পরিচালক প্রকৌশলী সৈয়দ মোফাছিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমাদের প্রকৌশলী অফিস নিয়মিত এসব বিষয় দেখভাল করে। প্রকল্প পরিচালকের পক্ষে সব সময় সেখানে উপস্থিত থাকা সম্ভব হয় না। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে নিরাপত্তাবিধি মেনে চলার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি অনেক শ্রমিকও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার করতে আগ্রহী হন না।

এ বিষয়ে প্রকৌশল দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কেউ বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কস দপ্তরের পরিচালক প্রকৌশলী মো. হাফিজুর রহমান বলেন, তারা প্রতিবেদন দিলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব। দেশে প্রচলিত বীমা নীতিমালা অনুযায়ী শ্রমিক মারা গেলে এক লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তবে এক লাখ টাকায় কোনো পরিবারের ক্ষতি পূরণ সম্ভব নয়। তাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকেই নিহত শ্রমিকের পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward