রাজশাহীর বাগমারা উপজেলায় দায়িত্ব পালনের দুই বছরে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও মানবিক নেতৃত্বের মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহবুবুল ইসলাম। ইতোমধ্যে তাঁর বদলির আদেশ জারি হয়েছে, যা স্থানীয়দের মধ্যে মর্মবেদনার সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি বাগমারা প্রেসক্লাবের উদ্যোগে এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, “বাগমারায় আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে যা কিছু ব্যর্থতা, তার সবই আমার এবং সফলতা আপনাদের। এই সময়ে আমার কার্যকলাপে কেউ কোনো কষ্ট পেয়ে থাকলে তা নিজ গুণে ক্ষমা করে দেবেন। ব্যক্তিগতভাবে আমি কারো মনঃকষ্টের কারণ হতে চাইনি। সরকারি বিধিবিধান মেনেই আমাকে চলতে হয়েছে।”
উপজেলায় কর্মরত বিভিন্ন দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা জানান, ২০২৪ সালের ১৯ মার্চ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই তিনি বাগমারার প্রশাসনিক কার্যক্রমে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং জনসেবাকে সহজ ও হয়রানিমুক্ত করতে নানা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিতি, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ততা তাঁকে একজন ব্যতিক্রমী প্রশাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি তাহেরপুর পৌরসভার প্রশাসকের দায়িত্বও দক্ষতার সঙ্গে পালন করছেন। তাঁর উদ্যোগে ব্যাংকিং পদ্ধতিতে হোল্ডিং ট্যাক্স আদায় চালু হওয়ায় কর আদায় বেড়েছে কয়েক গুণ এবং কমেছে হয়রানি। এছাড়া পৌর এলাকায় ১২০টি সৌরবিদ্যুৎচালিত বাতি স্থাপন ও একটি আধুনিক ডাম্পিং স্টেশন নির্মাণের মাধ্যমে নগর ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নে দুটি পৌরসভাকে সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে, যা অপরাধ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা, বাজার মনিটরিং এবং যানজট নিরসনে তাঁর উদ্যোগ সাধারণ মানুষের স্বস্তি বাড়িয়েছে।
কৃষিজমি রক্ষায় অবাধ পুকুর খনন বন্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে তিনি কৃষকবান্ধব প্রশাসক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। এছাড়া কৃষকদের পানবরজ পুড়ে যাওয়া কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়িয়ে আর্থিক সহায়তা প্রদান তাঁর মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
সামাজিক দায়বদ্ধতার জায়গা থেকেও তিনি মানবিকতার এক বিরল উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন। টাকার অভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া বা ভর্তি হতে না পারা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়ে ভর্তির ব্যবস্থা করেছেন। এরকম অজস্র নজির রয়েছে।
শিক্ষা খাতে তাঁর সরাসরি তদারকি, শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে উদ্যোগ শিক্ষার মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। পাশাপাশি ক্রীড়া ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। স্থানীয় পর্যায়ে খেলাধুলার উন্নয়ন, তরুণদের ক্রীড়ামুখী করতে বিভিন্ন আয়োজন এবং মাঠভিত্তিক কার্যক্রমে উৎসাহ প্রদানের মাধ্যমে তিনি বাগমারার ক্রীড়াঙ্গনে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছেন।
সাঁকোয়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ জিয়াউর রহমান মোল্লা বলেন, “দলমত নির্বিশেষে সবাই সেবা পেয়েছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ নজরদারির ফলে বেড়েছে শিক্ষার মান।”
বাগমারা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আলহাজ্ব আব্দুস সামাদ বলেন, “উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম একজন সৎ, দক্ষ, কর্মনিষ্ঠ মানুষ। তিনি নিজে সবসময় সৎ থেকেছেন এবং তাঁর অধীনস্থ কর্মীদের সৎ থাকার ব্যাপারে তাগিদ দিয়েছেন। উপজেলা পরিষদের সৌন্দর্য বর্ধনের কাজে এর আগে কোনো ইউএনও এত বেশি মনোযোগ দেননি। বর্তমান ইউএনও মাহবুবুল ইসলামের আমলে উপজেলা পরিষদ চত্বরে প্রায় ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৬৮ মিটার দীর্ঘ ওয়াকওয়ে নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে, যা সম্পন্ন হলে পরিবেশের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচলে সুবিধা হবে।”
ভবানীগঞ্জ সরকারি কলেজের প্রভাষক দীপালী খাতুন, অলকা রানী, রেশমা খাতুনসহ ১০-১২ জন শিক্ষক জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর আমাদের কলেজসহ বাগমারার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল, ওই সময় ইউএনও মাহবুবুল ইসলাম তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও ব্যক্তিমাধুর্য দিয়ে একে একে সব প্রতিষ্ঠানের সমস্যার সমাধান করে শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনেন। তিনি আপামর বাগমারাবাসীর কাছে দীর্ঘদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম বলেন, “আমি প্রজাতন্ত্রের একজন কর্মচারী হিসেবে জনগণের সেবা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। জানি না কতটুকু সফল হয়েছি। তাই আবার শুরুর কথাটি বলতে চাই—বাগমারায় আমার দীর্ঘ কর্মজীবনে যা কিছু ব্যর্থতা, তার সবই আমার এবং সফলতা আপনাদের। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন, শেষ পর্যন্ত আমি যেন আমার নীতি-আদর্শে অটল থাকতে পারি।”
বাগমারা (রাজশাহী) প্রতিনিধি 


















