ইসলাম মা-বাবার প্রতি সর্বোত্তম আচরণ করার নির্দেশ দিয়েছে। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত ও অসংখ্য হাদিসে মা-বাবার আনুগত্য এবং তাঁদের সঙ্গে সদাচরণ করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমার প্রতিপালক আদেশ দিয়েছেন, তিনি ছাড়া অন্য কারও ইবাদত না করতে এবং পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তাঁদের একজন অথবা উভয়েই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাঁদের উফ বলো না এবং তাঁদের ধমক দিও না; তাঁদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। মমতাবশে তাঁদের প্রতি নম্রতার পক্ষপুট অবনমিত করো এবং বলো, হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করো, যেভাবে শৈশবে তাঁরা আমাকে প্রতিপালন করেছেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ২৩–২৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সে অপমানিত হোক, সে অপমানিত হোক, সে অপমানিত হোক।’ জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল, কে? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি তার মা-বাবার একজনকে অথবা উভয়কে বার্ধক্যে পেল, অথচ তাঁদের সেবা করে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারল না। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৫১)
কোরআন ও হাদিসের এই শিক্ষা সাহাবায়ে কেরাম (রা.) তাঁদের জীবনে সর্বোত্তমভাবে ধারণ করেছিলেন। তাঁদের জীবনে মা-বাবার প্রতি সম্মান, ভালোবাসা ও সেবার অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। এর কয়েকটি তুলে ধরা হলো।
১. মায়ের সেবার গুরুত্ব
আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি তাঁর কাছে এসে বলল, আমি একজন নারীকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম। সে আমাকে বিয়ে করতে অস্বীকার করে। পরে অন্য একজন তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলে আমি তাকে বিয়ে করতে চাইতাম। বিষয়টি আমার আত্মমর্যাদায় আঘাত করে। তাই আমি সেই পুরুষকে হত্যা করেছি। আমার জন্য কি তাওবার সুযোগ আছে?
ইবনে আব্বাস (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন, তোমার মা কি জীবিত আছেন? লোকটি বলল, না। তখন তিনি বললেন, আল্লাহর কাছে তাওবা করো এবং যথাসম্ভব তাঁর নৈকট্য লাভের চেষ্টা করো।
আতা ইবনে ইয়াসার (রহ.) বলেন, আমি ইবনে আব্বাস (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি ওই ব্যক্তির মা জীবিত আছেন কি না, তা জানতে চাইলেন কেন? তিনি উত্তর দিলেন, মায়ের আনুগত্যের চেয়ে উত্তম কোনো নেক আমলের কথা আমার জানা নেই। (আত-তাবসিরা ফিল ওয়াজি: ১/১৮৭)
২. মায়ের ঋণ কখনো শোধ হওয়ার নয়
আবু বুরদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি ও আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) তাওয়াফ করছিলেন। এ সময় এক ব্যক্তিকে তাঁর মাকে পিঠে বহন করে বায়তুল্লাহ তাওয়াফ করতে দেখা গেল। সে বলছিল, ‘নিশ্চয়ই আমি তাঁর অনুগত উট। তাঁর বাহনগুলো ভীত-সন্ত্রস্ত হলেও আমি ভীত হই না।’
লোকটি ইবনে ওমর (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, হে ইবনে ওমর! আপনি কি মনে করেন, আমি আমার মায়ের প্রতিদান দিতে পেরেছি?
তিনি বললেন, না, তাঁর একটি দীর্ঘশ্বাসের প্রতিদানও দিতে পারোনি। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১১)
৩. মায়ের প্রতি সালাম ও দোয়া
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, মারওয়ান তাঁকে মদিনার প্রশাসক পদে নিজের স্থলাভিষিক্ত করেছিলেন। তখন তিনি জুল-হুলায়ফা নামক স্থানে অবস্থান করতেন। তিনি একটি ঘরে থাকতেন এবং তাঁর মা অন্য একটি ঘরে থাকতেন।
তিনি যখন ঘর থেকে বের হতেন, তখন মায়ের দরজায় দাঁড়িয়ে বলতেন, মা! আপনার প্রতি শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
তাঁর মা বলতেন, হে পুত্র! তোমার ওপরও শান্তি, রহমত ও বরকত বর্ষিত হোক।
তিনি আবার বলতেন, আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া করুন, যেভাবে আপনি আমার শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন। তাঁর মা দোয়া করে বলতেন, আল্লাহ তোমার প্রতিও দয়া করুন, যেভাবে তুমি আমার বার্ধক্যে আমার প্রতি সদাচরণ করছ।
এরপর তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করতেন, তখনও একইভাবে সালাম ও দোয়া করতেন। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ১২)
৪. মা-বাবাকে কষ্ট দেওয়া কবিরা গুনাহ
থাইসালা (রহ.) থেকে বর্ণিত, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.)-কে বলতে শুনেছেন, পিতা-মাতাকে কাঁদানো এবং তাঁদের অবাধ্য হওয়া কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৩১)
৫. বাবার প্রতি সম্মান প্রদর্শন
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি দুই ব্যক্তিকে দেখে তাঁদের একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন, ইনি তোমার কে হন? লোকটি বলল, তিনি আমার পিতা।
তখন আবু হুরায়রা (রা.) বললেন, তাঁকে নাম ধরে ডেকো না, তাঁর আগে আগে হেঁটো না এবং তাঁর আগে বসো না। (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৪৪)
মা-বাবার প্রতি সম্মান, তাঁদের সেবা এবং তাঁদের সঙ্গে সদাচরণ ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। সাহাবায়ে কেরামের জীবন থেকে আমরা শিখতে পারি, মা-বাবার প্রতি ভালোবাসা শুধু কথায় নয়, বরং আচরণ, আনুগত্য ও সেবার মাধ্যমেও প্রকাশ করতে হয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে মা-বাবার আনুগত্য করা, তাঁদের সেবা করা এবং তাঁদের প্রতি সদাচরণ করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
kalprakash.com/IM