সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, বিপুল আর্থিক নির্ভরতা এবং দ্বিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তির কারণে কঠিন কূটনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে পাকিস্তান। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাত নতুন করে তীব্র হওয়ায় সৌদি আরবের নিরাপত্তায় সহায়তা দেওয়ার চাপ বাড়ছে ইসলামাবাদের ওপর। তবে সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করতে চায় না দেশটি।
বিশ্লেষকদের মতে, সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি রক্ষা এবং ইয়েমেনের যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ এড়িয়ে চলার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
গত এপ্রিলে পাকিস্তানের ৩ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক ঘাটতি মোকাবিলায় জরুরি সহায়তা দেয় সৌদি আরব। পরে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা থেকে সৌদি আরবকে রক্ষায় যুদ্ধবিমান ও পাইলট পাঠায় পাকিস্তান। এদিকে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা এবং ইয়েমেনে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর নতুন অভিযান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
এ অবস্থায় দুই দেশের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি কার্যকর করেছে রিয়াদ। গত শনিবার সৌদি আরবের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৩ জন নিহত ও শত শত মানুষ আহত হওয়ার পর দেশটির নিরাপত্তায় পাকিস্তানের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ। পরদিন একই স্থাপনায় আরেকটি হামলায় এক পাকিস্তানি নাগরিক নিহত হন।
তবে সৌদি আরবের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিলেও ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার বিষয়ে এখনো স্পষ্ট অবস্থান জানায়নি ইসলামাবাদ। বরং ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে নিজেদের কূটনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে সংঘাত এড়ানোর চেষ্টা করছে দেশটি।
সৌদির সঙ্গে সম্পর্ক, ইরান নিয়ে উদ্বেগ
লাহোরভিত্তিক পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক এজাজ হায়দারের মতে, সৌদি আরবের ওপর আর্থিক নির্ভরতা এবং ইয়েমেনের সংঘাত থেকে দূরে থাকার আকাঙ্ক্ষা, এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে পাকিস্তানকে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ইরানের নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছেন, যাতে তাঁরা সৌদি আরবকে লক্ষ্যবস্তু করা হুতি ও ইরাকের শিয়া মিলিশিয়াদের নিয়ন্ত্রণে আনেন।
গত বছর ইসলামাবাদ ও রিয়াদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের পর গত আগস্টে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা অঙ্গীকার নবায়ন করে পাকিস্তান ও সৌদি আরব। পরে এ চুক্তিতে তুরস্কও যুক্ত হয়।
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক উমর করিমের মতে, হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরানকে রাজি করানোর পাকিস্তানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে ইয়েমেন ইস্যুতে পাকিস্তান ও ইরান এখন পরস্পরবিরোধী অবস্থানে রয়েছে।
গত সপ্তাহে চুক্তির স্বাক্ষরকারীরা জানান, হুতিরা সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও ট্যাংকারে হামলা আবার শুরু করেছে। পাশাপাশি লোহিত সাগরের উপকূলীয় বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথ বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে বলেও দাবি করা হয়। এ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবকে সামরিক বাহিনী ও প্রয়োজনীয় সক্ষমতা দিয়ে সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে পাকিস্তান ও তুরস্ক।
পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, সৌদি আরব এবং পবিত্র শহর মক্কা ও মদিনার নিরাপত্তা রক্ষায় তারা সর্বোচ্চ পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। তবে ইয়েমেনে হুতিদের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে পাকিস্তানি সেনা বা যুদ্ধবিমান অংশ নেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সামরিক সক্ষমতা থাকলেও রয়েছে সীমাবদ্ধতা
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীতে ছয় লাখ ৬০ হাজারের বেশি সদস্য এবং প্রায় ৪০০টি যুদ্ধবিমান ও ভূমিতে হামলা চালানোর বিমান রয়েছে। দেশটি ড্রোনও তৈরি করে। সীমান্তে বিদ্রোহ দমন এবং ভারতের সঙ্গে সংঘাতের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাদের।
তবে দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর বিদ্রোহীদের হামলায় পাকিস্তানের এক হাজার ২০০-এর বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিহত হন।
এদিকে গত সপ্তাহে হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের একটি বিমান অভিযানে ১০০টি যুদ্ধবিমান অংশ নেওয়ার কথা জানানো হয়। তবে পাকিস্তান ও তুরস্ক, কোনো দেশই তাদের পাইলটরা ওই অভিযানে অংশ নিয়েছেন কি না, তা নিশ্চিত করেনি।
পাকিস্তানের একটি সূত্রের দাবি, যৌথ অভিযানে সহায়তা করেছে ইসলামাবাদ। তবে কী ধরনের সামরিক সরঞ্জাম বা জনবল দিয়ে এ সহায়তা দেওয়া হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
যুদ্ধে জড়ানো নিয়ে জনমতও বড় বাধা
সৌদি আরবের পাশে দাঁড়ানোর চাপ থাকলেও ইয়েমেনে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের বিরোধিতা রয়েছে পাকিস্তানের জনগণের একটি বড় অংশের মধ্যে। দেশটির অনেকেই ইরানের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাঁদের দৃষ্টিতে, ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর পর পাকিস্তানে হাজারো মানুষ শোক প্রকাশ করেন।
বিশ্লেষক এজাজ হায়দারের মতে, সৌদি আরবের হয়ে যুদ্ধে জড়ালে পাকিস্তান কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে এবং ইরানের বিপক্ষে অবস্থান নিতে পারে। এ কারণে দেশটির জনগণের মধ্যে এমন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার আগ্রহ কম।
এর আগে ২০১৫ সালে ইয়েমেন যুদ্ধে যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও স্থলসেনা চেয়েছিল সৌদি আরব। তবে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফের সরকার সেই অনুরোধে সাড়া দেয়নি। পরে পাকিস্তানের সংসদ নিরপেক্ষ থাকার পক্ষে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবার পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সরকারের রাজনৈতিক ভিত্তি তুলনামূলক দুর্বল এবং সরকারটি সামরিক বাহিনীর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। ফলে সৌদি আরবের সামরিক সহায়তার অনুরোধ নিয়ে এবার প্রকাশ্য বিতর্কের সুযোগ কম বলে মনে করছেন তাঁরা।
আর্থিক নির্ভরতাও বাড়াচ্ছে চাপ
সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তির পাশাপাশি আর্থিক নির্ভরতাও পাকিস্তানের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতা সীমিত করছে। দেশটির আর্থিক সংকটের মধ্যে সৌদি আরবের কাছ থেকে ৩ বিলিয়ন ডলারের জরুরি ঋণ পেয়েছে ইসলামাবাদ। পাশাপাশি সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখা পাকিস্তানের ৫ বিলিয়ন ডলারের আমানতের মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। এ অর্থ পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের প্রায় ৩৮ শতাংশের সমান।
এ ছাড়া গত বছর সৌদি আরবে কর্মরত পাকিস্তানি শ্রমিকেরা দেশে ৯.৭৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। ফলে পাকিস্তানের অর্থনীতিতেও সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
গবেষক উমর করিমের মতে, সৌদি আরবের প্রতি প্রতিরক্ষা অঙ্গীকার পাকিস্তানকে ইয়েমেনের সংঘাতে আরও জড়িয়ে ফেলতে পারে। এতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ইসলামাবাদের ভূমিকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দেশে জনঅসন্তোষও বাড়তে পারে।
সব মিলিয়ে সৌদি আরবের নিরাপত্তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং অভ্যন্তরীণ জনমত সামাল দেওয়া, এ তিনটি বিষয় বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নিতে হবে পাকিস্তানকে। সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে কূটনৈতিক পথে সংকট সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই এখন ইসলামাবাদের জন্য বড় পরীক্ষা।
kalprakash.com/IM