পাকিস্তানের চারটি প্রদেশ ভেঙে দেশটিকে অনেকগুলো ছোট প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনা করছেন সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির, এমন দাবি করা হয়েছে ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের একটি প্রতিবেদনে। কেন এই পরিকল্পনা এবং এর পেছনে ক্ষমতা আরও শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, প্রতিবেদনটিতে এসব বিষয় বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রায় ২ হাজার বছরেরও বেশি আগে ম্যাসিডনের রাজা ফিলিপের মুখে প্রচলিতভাবে একটি প্রবাদবাক্য আরোপ করা হয়, ‘ভাগ করো ও শাসন করো’, যাকে ইংরেজিতে বলা হয় ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’। এরপর থেকে ক্ষমতা সুসংহত করতে স্বৈরশাসকেরা এই কৌশল ব্যবহার করে আসছেন। পাকিস্তানের সামরিক প্রধান কার্যত দেশটি শাসন করেন, যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর ঊর্ধ্বতন হিসেবে একজন রাষ্ট্রপতি ও একজন প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন। মনে হচ্ছে, তিনি এই নীতির শিক্ষাটিকে আক্ষরিক অর্থেই গ্রহণ করেছেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের প্রভাব রয়েছে। তাঁর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশটির বর্তমান চারটি প্রদেশকে ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করা হতে পারে। প্রতিবেদনে এই সম্ভাব্য পরিকল্পনাকে ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এ পরিকল্পনায় চারটি প্রদেশের পরিবর্তে ১২, ১৫ কিংবা ১৬০টি ছোট প্রদেশ গঠনের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রদেশগুলো ভাগ করার বিষয়ে পাকিস্তান সরকার বা সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
পাকিস্তানের চারটি প্রধান প্রদেশ হলো পাঞ্জাব, সিন্ধু, খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান। খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তান প্রদেশে চলা দীর্ঘস্থায়ী বিদ্রোহ ও সাম্প্রতিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে চরম সংকটে রয়েছে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রদেশগুলোর এই কাঠামো অপরিবর্তিত রয়েছে। দেশটির সবচেয়ে জনবহুল প্রদেশ পাঞ্জাব। সেখানে প্রায় ১২ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বাস করেন, যা পাকিস্তানের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি। অন্যদিকে সবচেয়ে কম জনসংখ্যার প্রদেশ বেলুচিস্তান। সেখানে প্রায় দেড় কোটি মানুষের বাস, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশ।
দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তানের প্রশাসনিক ব্যবস্থা সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন সমর্থকেরা। তাঁদের মতে, বর্তমান চার প্রদেশের কাঠামোর কারণে দেশটির শাসনব্যবস্থা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করার পরিকল্পনার পক্ষে যুক্তি থাকলেও এর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সমালোচকেরা। দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নতুন ছোট প্রদেশগুলো নির্বাচিত প্রধান, প্রাদেশিক বা জেলা পরিষদ কিংবা সরকারের মনোনীত ব্যক্তিদের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে।
সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ব্যবস্থায় প্রশাসনিক ক্ষমতা শেষ পর্যন্ত সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের হাতেই কেন্দ্রীভূত হতে পারে। প্রদেশগুলো আয়তনে অনেক বড় হওয়ায় সেগুলো সঠিকভাবে পরিচালনা করা কঠিন বলে মনে করেন মুনির। এ কারণেই পাকিস্তানের বর্তমান দুরবস্থা তৈরি হয়েছে বলে তাঁর দাবি। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশটির অর্থনৈতিক সংকটের পেছনে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাকিস্তানে মূল্যস্ফীতি এখনো দুই অঙ্কের ঘরে রয়েছে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হারও ভারতের অর্ধেকের কম। প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় অর্থের ওপর নির্ভরশীল। পাশাপাশি দেশের মূল্যবান জমির বড় অংশের মালিকানা এবং বিভিন্ন ব্যবসায় তাদের প্রভাব রয়েছে। এসব ব্যবসায় প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর চাপ সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের অর্থনৈতিক সংকটের কারণ খুঁজতে হলে শুধু প্রদেশের আয়তন নয়, সেনাবাহিনীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও বিবেচনায় নিতে হবে। পাকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর থেকে দেশটির দুই-পঞ্চমাংশেরও বেশি সময় সরাসরি সামরিক শাসনের অধীনে ছিল। বাকি সময়ের বেশির ভাগে বেসামরিক সরকার ক্ষমতায় থাকলেও সেনাবাহিনীর প্রভাবের কারণে তারা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক বজায় রাখার নীতি পাকিস্তানের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে এই বৈরী সম্পর্ক সামরিক বাহিনীর প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে নিরাপত্তা সমস্যার সমাধানের কথা বলে, তাদের নীতিই সেই সমস্যাকে টিকিয়ে রাখতে ভূমিকা রাখছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়তে পারে এবং রাজনৈতিক ভারসাম্য দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এর প্রথম কারণ হলো, পাকিস্তানে রাজনৈতিক মতের বৈচিত্র্য সীমিত। দেশটির বড় প্রদেশগুলো কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। পাঞ্জাবে পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজ (পিএমএল-এন) এবং সিন্ধুতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) দীর্ঘদিনের প্রভাব রয়েছে। সিন্ধু প্রদেশের রাজধানী করাচি দেশটির প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র।
দ্য ইকোনমিস্টের মতে, সামরিক শাসনের সময়েও এই দলগুলো একটি নির্দিষ্ট মাত্রায় বিকল্প ক্ষমতাকেন্দ্র হিসেবে টিকে ছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ কারণেই প্রদেশগুলোকে ভাগ করার পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে আসিম মুনিরের হাতে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। দ্য ইকোনমিস্ট তাঁকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে বর্ণনা করেছে, যিনি নিজের হাতে ক্ষমতা ধরে রাখতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে দ্বিধা করেন না। প্রদেশগুলো ছোট ছোট অঞ্চলে ভাগ করা হলে স্থানীয় ক্ষমতাকেন্দ্রগুলো দুর্বল হতে পারে এবং সেনাপ্রধানের প্রভাব আরও বাড়তে পারে। তবে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে কী ঘটবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের প্রধান রাজনৈতিক দল পিএমএল-এন ও পিপিপি সামরিক নেতৃত্বের প্রভাবের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই নেতা ইমরান খান কারাগারে রয়েছেন। তাঁর সমর্থকদের বিক্ষোভেও নানা বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রদেশ ভাগের পরিকল্পনায় স্থানীয় সরকার শক্তিশালী হওয়ার চেয়ে সেনাপ্রধানের ক্ষমতা আরও বাড়ার আশঙ্কাই বেশি। তবে এ বিষয়ে পাকিস্তান সরকার বা সেনাবাহিনীর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, এনডিটিভি
kalprakash.com/IM