ফ্রান্সের উচ্চ বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়ছে। অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, শ্রেণিকক্ষে জায়গার সংকট ও শিক্ষকসংকটসহ শিক্ষা খাতের নানা সমস্যার প্রতিবাদে শুরু হওয়া এই আন্দোলনে মঙ্গলবার দেশজুড়ে ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ জানিয়েছেন, আটক ব্যক্তিদের বেশির ভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
রাজধানী প্যারিসে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ গত কয়েক দিনে ইল-দ্য-ফ্রঁসসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। বিক্ষোভকারীরা বেশ কয়েকটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রবেশপথ অবরোধ করে কর্মসূচি পালন করছেন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পড়াশোনার পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষকদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপও পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছে।
১৬ বছর বয়সী এক ছাত্রী বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমরা এখানে একটি বার্তা দিতে এসেছি। কোনো কারণ ছাড়াই সবকিছু ভাঙচুর করতে আসিনি। আমরা বলতে এসেছি, শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। আমাদের প্রতিটি শ্রেণিতে ৩৪ জন শিক্ষার্থী। এভাবে চলা সম্ভব নয়। শিক্ষকদের ওপরও অনেক বেশি চাপ।’
মঙ্গলবারের বিক্ষোভে অন্তত ১০ জন শিক্ষক ও কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৪৮ সদস্যও।
ফরাসি শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিক্ষোভের কারণে অন্তত ৪০০টি স্কুল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধার মুখে পড়েছে।
বিভিন্ন স্থান থেকে পাওয়া ছবি ও ভিডিওতে বিক্ষোভকারীদের ময়লার পাত্রে আগুন দিতে দেখা গেছে। কয়েকটি বাসস্টপও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে মারে। জবাবে পুলিশ লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ফরাসি টেলিভিশন চ্যানেল বিএফএমটিভিকে বলেন, মঙ্গলবার ৪৪০ জনকে আটক করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘চূড়ান্ত সংখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি। তবে আমাকে বলা হয়েছে, আটক ব্যক্তিদের দুই-তৃতীয়াংশকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।’
এর আগে সোমবারের বিক্ষোভে ১৬৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তবে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিয়ন সিন্ডিকাল লিসেয়েনের সভাপতি রিয়াদ রানি এএফপিকে বলেন, ফরাসি সরকার শিক্ষার্থীদের ওপর ‘দমন-পীড়ন’ চালাচ্ছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহারের অভিযোগও করেন তিনি।
অন্যদিকে পুলিশের পদক্ষেপের সমালোচনার বিষয়ে নুনেজ বলেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ‘অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণভাবে’ পরিস্থিতি মোকাবিলা করেছে।
ফরাসি শিক্ষামন্ত্রী এদুয়ার জেফ্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ করার অধিকার রয়েছে। তবে সহিংসতার ঘটনাগুলোর নিন্দা জানিয়ে তিনি বলেন, এসব ঘটনা ‘কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না’।
তিনি আরও বলেন, ‘বিক্ষোভ করার অধিকার একটি মৌলিক স্বাধীনতা। তবে এই অধিকারকে এমন কর্মকাণ্ডের অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যায় না।’
স্কুল অবরোধ আরও বাড়ানোর আহ্বান এবং সহিংস কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে জেফ্রে বলেন, এসব কর্মকাণ্ড শিক্ষার্থী ও সরকারি কর্মীদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার সতর্ক করে বলেন, শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ আরও ছড়িয়ে পড়া ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশে আতশবাজি, আগুন ও সহিংসতার মতো কোনো ঘটনাই শিক্ষার্থী, স্কুলের কর্মী বা পুলিশ কর্মকর্তাদের ঝুঁকির মধ্যে ফেলার কারণ হতে পারে না।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের পাশাপাশি মঙ্গলবার ফ্রান্সজুড়ে বিভিন্ন ইউনিয়নের ডাকা ধর্মঘটও পালিত হয়েছে। শিক্ষক, হাসপাতালকর্মী ও সরকারি কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী ইউনিয়নগুলো কম বেতন ও কর্মপরিবেশসহ বিভিন্ন সমস্যার প্রতিবাদে এই কর্মসূচি পালন করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নুনেজের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে এসব ধর্মঘটে অন্তত ২ লাখ মানুষ অংশ নিয়েছেন। তবে অধিকাংশ এলাকায় ধর্মঘট ও বিক্ষোভ বড় ধরনের কোনো ঘটনা ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয়েছে।
kalprakash.com/IM