৪৫ বছরের জীবনের বড় একটি অংশ কেটেছে ক্রিকেটের মাঠে। বয়সভিত্তিক ক্রিকেট থেকে ঘরোয়া ক্লাব, প্রথম শ্রেণি ও ‘এ’ দল হয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলেও খেলেছেন তিনি। খেলেছেন তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে। অথচ এত দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারে নিজের শরীরে একটি কিডনি নেই—এ তথ্যই জানতেন না সাবেক জাতীয় দলের অফ স্পিনার ফাহিম মুনতাসির।
বাংলাদেশের ক্রিকেটে ‘সুমিত’ নামে পরিচিত ফাহিম ২০২৩ সালে ভারতের দিল্লিতে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে গিয়ে জানতে পারেন, তাঁর জন্ম থেকেই বাঁ পাশের কিডনি নেই। আলট্রাসনোগ্রাম করার সময় চিকিৎসকের সন্দেহের পর পরীক্ষায় বিষয়টি নিশ্চিত হয়।
ফাহিম চিকিৎসককে জানিয়েছিলেন, তাঁর কখনো কোনো অস্ত্রোপচার হয়নি। এরপর চিকিৎসক জানান, তিনি জন্মগতভাবেই একটি কিডনি নিয়ে বেড়ে উঠেছেন। একটি কিডনি নিয়ে সুস্থভাবে জীবনযাপন করা সম্ভব হলেও থাকা কিডনিটির সুস্থতা ধরে রাখার বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন চিকিৎসক।
তবে তখন ফাহিমের একমাত্র কিডনিতেও সমস্যা দেখা দিয়েছিল। রক্তে কিডনির কার্যক্ষমতার অন্যতম সূচক ক্রিয়েটিনিনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছিল।
দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ার
১৯৯৮ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপে প্লেট চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ যুব দলের সদস্য ছিলেন ফাহিম। পরের বছর তিনি যুব দলের নেতৃত্বও দেন। একই বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ‘এ’ দলের বিপক্ষে ঢাকায় তাঁর প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়।
আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফাহিমের অভিষেক ২০০১ সালের নভেম্বরে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়ানডে দিয়ে। ওই সিরিজে দুটি ওয়ানডে খেলার পর ২০০২ সালের সেপ্টেম্বরে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিজের তৃতীয় ও শেষ ওয়ানডে খেলেন তিনি।
২০০২ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয় ফাহিমের। সব মিলিয়ে তিনি বাংলাদেশের হয়ে তিনটি টেস্ট ও তিনটি ওয়ানডে খেলেছেন। প্রথম শ্রেণিতে ৩৭টি এবং লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৩৩টি ম্যাচ খেলেছেন।
খেলোয়াড়ি জীবন শেষে কোচিংয়েও যুক্ত হন ফাহিম। লেভেল-২ কোচিং কোর্স সম্পন্ন করে মোহামেডানের মতো ক্লাবে কোচ হিসেবে কাজ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে ম্যানেজার ও আন্তর্জাতিক দলগুলোর লিয়াজোঁ অফিসারের দায়িত্বও পালন করেছেন।
ক্রিকেটারদের কাছেও ছিল অজানা
ফাহিমের দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারে সতীর্থদের কাছেও তাঁর একটি কিডনি থাকার বিষয়টি ধরা পড়েনি। জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার বলেন, খেলোয়াড়ি জীবনে তাঁরা কখনো বুঝতে পারেননি যে ফাহিমের একটি কিডনি নেই। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ফাহিম ছিলেন অত্যন্ত ফিট এবং ভালো অফ স্পিনার।
সাবেক জাতীয় দলের ওপেনার হান্নান সরকারও জানান, ফাহিমকে কখনো ফিটনেস বা চোটের কারণে দল থেকে বাদ পড়তে দেখেননি। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে দীর্ঘ সময় বোলিং করলেও তাঁর কোনো শারীরিক সমস্যা চোখে পড়েনি।
বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান চিকিৎসক ডা. দেবাশীষ চৌধুরী বলেন, একটি কিডনি থাকলে ক্রিকেট খেলা নিষিদ্ধ—এমন কোনো নিয়ম নেই। তবে একমাত্র কিডনিটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে জীবনহানির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে এ ধরনের ক্ষেত্রে সাধারণত খেলাধুলা থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
এখন ডায়ালাইসিস চলছে
এ বছরের জানুয়ারি থেকে কিডনির সমস্যা গুরুতর আকার নেয় ফাহিমের। ৩০ জানুয়ারি থেকে তাঁর ডায়ালাইসিস শুরু হয়েছে। বর্তমানে সপ্তাহে দুই দিন ডায়ালাইসিস নিতে হচ্ছে তাঁকে। চিকিৎসকেরা কিডনি প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন।
ফাহিমের চিকিৎসার জন্য ভারত বা পাকিস্তানে আনুমানিক ৫০ লাখ টাকা ব্যয় হতে পারে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) ও ক্রিকেটারদের সংগঠন কোয়াবের পক্ষ থেকে আর্থিক সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
নিজের অভিজ্ঞতা থেকে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটারদের জন্য একটি পরামর্শও দিয়েছেন ফাহিম। তাঁর মতে, খেলোয়াড়দের জন্য পেনশনের মতো ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন, যাতে ক্যারিয়ার শেষে চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে তাঁদের সমস্যায় পড়তে না হয়।
kalprakash.com/IM