রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার পর্যটন এলাকা সাজেকে শান্তিলাল চাকমাকে নৃশংসভাবে হত্যার চাঞ্চল্যকর মামলায় নিহতের ভাতিজা আলোময় চাকমা (৩২) ও ছেলে সোহেল চাকমাকে (২২) মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে দণ্ডিত উভয়কে ৫০ হাজার টাকা করে অর্থদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাঙামাটির জেলা ও দায়রা জজ মো. আহসান তারেক জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। আদালতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালত প্রতিষ্ঠার পর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আদেশ দিয়ে এটিই প্রথম কোনো ঐতিহাসিক রায়।
রায় ঘোষণার সময় আসামি সোহেল চাকমা কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন। পরে তাকে কড়া পুলিশি পাহারায় রাঙামাটি জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। অন্যদিকে মামলার প্রধান আসামি আলোময় চাকমা উচ্চ আদালত থেকে জামিনে মুক্তির পর থেকেই পলাতক রয়েছেন। আদালত তার বিরুদ্ধে সাজা ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির আদেশ দিয়েছেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, আলোময় চাকমা পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠন ইউপিডিএফের একজন সক্রিয় সদস্য।
হত্যাকাণ্ডের রোমহর্ষক বিবরণ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ মামলার নথি ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষীদের বিবরণ অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট রাত সাড়ে ১০টার দিকে সাজেক ইউনিয়নের ভাইবোনছড়া এলাকায় নিজ বাড়ি থেকে ঘুমন্ত শান্তিলাল চাকমাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যান আলোময় ও সোহেল চাকমা। বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে নির্জন সড়কে নিয়ে গলায় গামছা পেঁচিয়ে তাকে শ্বাসরোধের চেষ্টা করা হয় এবং একপর্যায়ে ধারালো দা দিয়ে গলা কেটে নৃশংসভাবে হত্যা নিশ্চিত করা হয়। এমনকি মামলার সাক্ষ্য ও জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের পর ভিকটিমের রক্ত পানের মতো ভয়াবহ ও পৈশাচিক তথ্যও উঠে আসে। পরবর্তীতে মরদেহটি গাছের গুঁড়ির সঙ্গে বেঁধে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে পাহাড়ি গঙ্গারাম নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। ঘটনার প্রায় নয় দিন পর কাচালং নদীর লাইল্যাগোনা এলাকা থেকে শান্তিলাল চাকমার অর্ধগলিত পচনধরা মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়।
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেন, হত্যাকাণ্ডটিতে দুই আসামিরই সক্রিয় ও সমান ভূমিকা ছিল। আলোময় চাকমা ভিকটিমকে বাড়ি থেকে বের করে গলায় গামছা পেঁচান এবং নিহতের ছেলে সোহেল চাকমা গামছার অপর প্রান্ত শক্ত করে চেপে ধরে বাবাকে দা দিয়ে গলা কাটেন। সুরতহাল, ময়নাতদন্ত ও ১৯ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য পর্যালোচনায় রাষ্ট্রপক্ষ আসামিদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। এটি একটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও কোল্ড ব্লাডেড হত্যাকাণ্ড হওয়ায় আসামিদের লঘুদণ্ড দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
রাঙামাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) অ্যাডভোকেট প্রতিম রায় পাম্পু বলেন, ‘ঘটনার শুরু থেকেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষ নিবিড়ভাবে কাজ করেছে। পাহাড়ি এলাকায় এমন নৃশংস পিতৃহত্যার ঘটনায় আদালত যে দৃষ্টান্তমূলক রায় দিয়েছেন, তাতে সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হলো।’
উল্লেখ্য, স্থানীয় বাসিন্দা বিনয় শঙ্কর চাকমার অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের ৬ আগস্ট সাজেক থানায় দণ্ডবিধির ৩৬৪, ৩০২, ৫০৬, ২০১ ও ৩৪ ধারায় মামলাটি দায়ের করা হয়। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সাজেক থানার উপপরিদর্শক (এসআই) সফিকুল ইসলাম ওই বছরের ১৫ অক্টোবর আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন এবং ২০১৮ সালের ২৮ মার্চ আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হলো।
kalprakash.com/IM