রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ায় অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাসই সরাসরি জড়িত বলে নিশ্চিত করেছে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। আসামিদের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির বরাত দিয়ে পুলিশ জানিয়েছে, চারজনের মধ্যে শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে প্রথমে বাড়ির ছাদেই শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। পরবর্তীতে ঘটনা আড়াল করতে গণপতির মরদেহ টিন দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয় এবং স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছাদের সিঁড়ির দরজার আড়ালে রাখা হয়, যাতে প্রতিবেশীদের ছাদ থেকে তা দেখা না যায়।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকালে রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার কার্যালয়ে মামলার তদন্তের অগ্রগতি জানাতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ।
সংবাদ সম্মেলনে আদালতে দেওয়া আসামি সিদ্ধার্থ দাসের ১৬৪ ধারার জবানবন্দির অংশবিশেষ তুলে ধরে পুলিশ কমিশনার জানান, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টার পর সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ ইয়াবা নিয়ে তাঁদের বন্ধু সীমান্তের বাসায় যান এবং সেখানে তিনজন মিলে ইয়াবা সেবন করেন। পরে রাত ৩টার দিকে আরও নেশাদ্রব্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে কামাল কাছনার মাদক কারবারি শান্তর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানে মুঠোফোন বন্ধক রেখে আরও চারটি ইয়াবা কেনেন তাঁরা।
পুলিশের তদন্তে উঠে আসে, রাত ৩টার পর সীমান্তের বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় কুকুর দেখে ভয়ে প্রাচীর টপকে পাশের দেবুদের বাড়িতে ঢোকেন দুই আসামি। এরপর দেবুদের বাড়ির ছাদ দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ওঠেন। ছাদটি হাফ-ওয়াল দিয়ে ঘেরা থাকায় এবং বাইরে থেকে দেখা না যাওয়ায় তাঁরা পানির ট্যাংকের আড়ালে বসে ভোর পর্যন্ত মোট আটটি ইয়াবা সেবন করেন।
ভোরবেলা গণপতি চক্রবর্তী ছাদে হাঁটতে এসে তাঁদের দেখে ধমক দিয়ে বলেন, ‘তোরা এত সকালে এখানে কী করিস?’ এতে নিজেদের অপকর্ম ফাঁস হয়ে সম্মানহানির ভয়ে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে গণপতি চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। পরে তাঁর নিথর দেহ টিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়।
কিছুক্ষণ পর নিচ থেকে শব্দ শুনে গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তী ছাদে এসে চিৎকার শুরু করলে মুগ্ধ গামছা দিয়ে স্ত্রীর গলা চেপে ধরেন এবং সিদ্ধার্থ মেয়ের মুখ ও গলা চেপে ধরেন। স্ত্রীকে হত্যার পর একই গামছা ও কবুতরের খাবার রাখার বাক্স থেকে রশি এনে দুই দিক থেকে টেনে মেয়েকেও হত্যা করা হয়।
ছাদে তিনজনকে হত্যার পর তাঁরা নিচে নেমে দেখেন গণপতির ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী ঘুম থেকে উঠেছে। সিদ্ধার্থকে দেখে সে বলে, ‘সিদ্ধার্থ দাদা, তুমি এখানে কেন?’ তখন কোনো সুযোগ না দিয়ে কাপড় পেঁচিয়ে তাকেও শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে সিসিটিভি ক্যামেরা থাকার ভয়ে ছাদে পড়ে থাকা পুরোনো প্লাস দিয়ে বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগের তার কেটে দেন আসামিরা। এরপর ক্লান্ত হয়ে তাঁরা ওই বাসায়ই গোসল করেন এবং সঙ্গে থাকা অবশিষ্ট একটি ইয়াবা সেবন করেন। ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে সাজাতে ঘরের ড্রয়ার খুলে মালামাল তছনছ করেন এবং আলমারি থেকে স্বর্ণালঙ্কার ও নগদ ১৫ হাজার টাকা লুট করেন। পরে জুমার নামাজের সময় ছাদ ও দেয়াল টপকে তাঁরা পালিয়ে যান। লুণ্ঠিত টাকা থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা দিয়ে সিদ্ধার্থ তাঁর বন্ধক রাখা মোবাইল ফোনটি ছাড়িয়ে নেন।
পুলিশ কমিশনার জানান, অপর আসামি মুগ্ধ দাসও আদালতে একই ধরনের স্বীকারোক্তি দিয়েছেন। বর্তমানে তাঁদের ডোপ টেস্ট ও ডিএনএ প্রোফাইলিংয়ের কাজ চলছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদনে চারজনকেই শ্বাসরোধে হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে এবং নিহত দুই নারীর ভ্যাজাইনাল সোয়াব পরীক্ষায় ধর্ষণের কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া শ্বাসরোধের সময় শারীরিক প্রতিক্রিয়ায় নির্গত জৈবিক তরল নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তি স্পষ্ট করেন তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সীমান্ত দাস ও দখিগঞ্জ শ্মশানের কেয়ারটেকার বিদ্যুৎ দাসের জবানবন্দি রেকর্ডের কথাও জানানো হয়। বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে সংবাদ সম্মেলন শেষ করেন পুলিশ কমিশনার।
kalprakash.com/IM