গ্রামবাংলার হারিয়ে যাওয়া লোকজ সাহিত্য ও ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে তরুণদের উদ্যোগে পাবনার চাটমোহরে বসছে ঐতিহ্যবাহী পুঁথি পাঠের আসর। আগামী বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট ২০২৬) রাতে চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহার পাড়ায় কিতাব প্রামাণিকের বাড়ির উঠানে এ আসর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
চাঁদ, কুপী আর হারিকেনের আলো-আঁধারিতে গায়েনের মায়াবী সুরের জাদুতে উঠানে মাদুর বিছিয়ে গোল হয়ে বসে শ্রোতারা একসময় হারিয়ে যেতেন রূপকথার কল্পলোকে। অতীতে এ ধরনের আসরে পাঠ করা হতো—আমীর হামজা, শাহনামা, আলিফ লায়লা, হাতেম তাই, কমলা সুন্দরীর পুঁথি, দেলদার কুমার ও শাহজাদী দিল পিঞ্জির কিচ্ছা, জঙ্গনামা, আমির সওদাগর ও ভেলুয়া সুন্দরীর পুঁথি, গাজী কালু ও চম্পাবতী কন্যার পুঁথি, তাজকিরাতুল আউলিয়া, কাসাসুল আম্বিয়া, বিবি সোনাভান, ফকির বিলাস, লাইলী মজনু প্রভৃতি। বিশেষ করে হানিফা, হামজা, হাতেম তাই, সোহরাব-রুস্তম, জৈগুন বিবি প্রমুখ বীর চরিত্র নিয়ে রচিত কাব্যগুলো ছিল অত্যন্ত জনপ্রিয়। তবে কালের বিবর্তন, আকাশ সংস্কৃতির প্রভাব এবং আধুনিকতার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সেই পুঁথি পাঠের আসর আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
উপমহাদেশে পুঁথি সাহিত্যের বিস্তার শুরু হয়েছিল আনুমানিক অষ্টাদশ শতকে। ১৬৮০-১৭৭০ খ্রিস্টাব্দে হুগলির বালিয়া-হাফেজপুরের কবি ফকির গরীবুল্লাহ ‘আমীর হামজা’ রচনার মধ্য দিয়ে এ পুঁথি কাব্যধারার সূত্রপাত করেন। ভাষাবিদ ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের মতে, পুঁথি সাহিত্যের প্রায় বত্রিশ শতাংশ শব্দ ছিল বিদেশি। মধ্যযুগে প্রায় পাঁচশ বছর ধরে প্রচলিত বাংলা সাহিত্যরীতির চেয়ে এটি ছিল সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। ধারণা করা হয়, কলকাতা, হাওড়া, হুগলি ও চব্বিশ পরগনা অঞ্চলের মানুষের কথ্যভাষাই ছিল এর মূল উৎস।
সময়ের পালাবদলে পুঁথি সাহিত্যের সেই সোনালী যুগ আর না থাকলেও চাটমোহরে আজও কেউ কেউ ধরে রেখেছেন এই লোকজ চর্চা। তেমনই একজন চাটমোহরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ আসাদুজ্জামান দুলাল। এ আসরকে ঘিরে বর্তমানে এলাকায় হাতে লেখা পোস্টারের মাধ্যমে চালানো হচ্ছে ব্যতিক্রমী প্রচারণা। অনুষ্ঠানে আসাদুজ্জামান দুলাল পাঠ করবেন ‘বিবি সোনাভান’ পুঁথি এবং মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক পাঠ করবেন ‘গাজী কালু ও চম্পাবতী’ পুঁথি।
ঐতিহ্যবাহী এ পুঁথি পাঠের আসর সফল করতে সার্বিক সহযোগিতা করছেন সজল বিশ্বাস, বিপ্লব আচার্য, নিয়ামুল মুক্তা, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভ কুণ্ডু, শুভ কর্মকারসহ স্থানীয় তরুণ ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
kalprakash.com/IM