বৈশ্বিক উষ্ণতা মোকাবিলায় নিজেদের নেতৃত্বের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী করতে ২০২৮ সালের জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন (কপ-৩৩) আয়োজনের প্রস্তাব দেওয়ার কথা বিবেচনা করছে চীন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি এ তথ্য জানিয়েছে।
তবে কপ-৩৩ আয়োজনের বিষয়ে চীন এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি। সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুনির্দিষ্ট সময়সীমাও নির্ধারণ করা হয়নি। তাছাড়া চলতি বছরই সম্মেলনের আয়োজক দেশ চূড়ান্ত করতে হবে—এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই। চীনের এই আগ্রহের খবর প্রথম প্রকাশ করে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ নিউজ।
জাতিসংঘের বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলনগুলো বিভিন্ন আঞ্চলিক জোটের মধ্যে পালাক্রমে অনুষ্ঠিত হয়। চলতি বছরের কপ-৩১ তুরস্কে এবং ২০২৭ সালের কপ-৩২ ইথিওপিয়ায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ২০২৮ সালের সম্মেলন আয়োজনের দায়িত্ব পড়বে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ওপর।
এর আগে গত এপ্রিল মাসে ভারত কপ-৩৩ আয়োজনের প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। তবে কেন প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করা হয়েছে, তা দেশটি স্পষ্ট করেনি। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়াও এর আগে সম্মেলনটি আয়োজনের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল।
চীনের এই সম্ভাব্য উদ্যোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া মেলেনি।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের (ইউএনএফসিসিসি) সচিবালয় এএফপিকে জানিয়েছে, কপ-৩৩-এর আয়োজক দেশ হিসেবে এখনো কোনো দেশের নাম এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক জোট তাদের জানায়নি। সচিবালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, কোনো দেশ আয়োজক হওয়ার প্রস্তাব দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক জোটের সদস্য দেশগুলো নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। ঐকমত্যে পৌঁছানোর পর আঞ্চলিক জোটের চেয়ারম্যান আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের সচিবালয়ে আয়োজক দেশের নাম প্রস্তাব করেন।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে নিজেদের অবস্থানকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরছে চীন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র প্যারিস জলবায়ু চুক্তি থেকে দ্বিতীয়বারের মতো বেরিয়ে গেছে এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করা চীনের জন্য বৈশ্বিক জলবায়ু নেতৃত্বে নিজেদের অবস্থান আরও দৃঢ় করার বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটির এ ক্ষেত্রে জোরালো অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে। কারণ সৌর প্যানেল, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুবিদ্যুৎ টারবাইন ও ব্যাটারিসহ বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি রপ্তানিতে চীন বিশ্বে শীর্ষে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কও বিবেচনায় তবে সম্মেলন আয়োজন করলে চীনকে নিজেদের জলবায়ু রেকর্ডের বিষয়েও কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হতে পারে। ১৪০ কোটির বেশি জনসংখ্যা এবং বিশাল শিল্প উৎপাদনের কারণে চীন বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণকারী দেশ। এর পরেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
চীন ২০৬০ সালের মধ্যে কার্বন নিরপেক্ষতা অর্জনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে ২০৩৫ সালের মধ্যে অর্থনীতিজুড়ে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ সর্বোচ্চ পর্যায়ের তুলনায় মাত্র ৭ থেকে ১০ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে দেশটি।
একটি সূত্র জানিয়েছে, কপ-৩৩ আয়োজনের বিষয়টি পর্যালোচনার ক্ষেত্রে চীন যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের গতিপ্রকৃতিও হিসাব করছে। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও বারাক ওবামার সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ওয়াশিংটন-বেইজিং সহযোগিতা দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। ২০২৮ সালে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে কপ-৩৩ দুই দেশের মধ্যে নতুন করে জলবায়ু সহযোগিতার সুযোগ তৈরি করতে পারে। সম্মেলনটি সম্ভবত ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক দিন পর অনুষ্ঠিত হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ই৩জি-এর বিশেষজ্ঞ অ্যালডেন মেয়ার বলেন, গত ৩৫ বছরে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার আন্তর্জাতিক মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক কখনো অগ্রগতির, আবার কখনো উত্তেজনার কারণ হয়েছে। আগামী মার্কিন নির্বাচনের ফল যা-ই হোক না কেন, বৃহত্তর যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ অব্যাহত থাকবে।
kalprakash.com/IM