গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চর চরিতার এক সংগ্রামী নারীর নাম বেহেলা বেগম। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। টিনের চালার ছোট্ট একটি ঘরে অসুস্থ স্বামী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তার বসবাস। কিন্তু সেই ঘরটিও এখন তিস্তার ভাঙনের হুমকিতে।
বারো বছর ধরে এই চরে বসবাস করছেন বেহেলা। জীবনের এই সময়ে অনেক কিছু বদলেছে—সন্তান হয়েছে, সংসারে অভাব এসেছে, স্বামী অসুস্থ হয়েছেন। কিন্তু বদলায়নি একটি বিষয়, নিজের নামে একটুকরো জমি হয়নি কখনো।
দিনমজুরের কাজ করেই সংসার চালান তিনি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অন্যের জমিতে কাজ করে প্রতিদিন আয় হয় তিনশো থেকে সাড়ে তিনশো টাকা। সেই টাকায় চলে পাঁচজনের সংসার। তার স্বামী দীর্ঘদিন ধরে প্যারালাইসিস ও ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। নিয়মিত ওষুধ কেনার সামর্থও অনেক সময় থাকে না।
অভাবের কারণে তিন সন্তানের কেউ স্কুলে যেতে পারে না। ভোরে কাজে বের হলে সন্তানরা অসুস্থ বাবার পাশে থাকে। অনেক দিন চুলায় আগুনও জ্বলে না। প্রতিবেশীদের সহায়তায় কোনোভাবে চলে দিন।

তিস্তা নদী এ অঞ্চলের মানুষের কাছে শুধু একটি নদী নয়, বরং আতঙ্কের নাম। প্রতি বর্ষায় নদী ভাঙে, ঘরবাড়ি বিলীন হয়। বেহেলা এর আগেও দুইবার ভিটেমাটি হারিয়েছেন। প্রতিবার নতুন জায়গায় গিয়ে আবার ঘর তুলেছেন। কিন্তু এবার নদীর ভাঙন এসে পৌঁছেছে একেবারে দরজার সামনে।
নিজের জমি নদীগর্ভে চলে যাওয়ার পর নতুন জায়গায় বসবাসের জন্য জমি নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। কিন্তু ৫০ হাজার টাকার কথা শুনে সেই স্বপ্নও ভেঙে যায়। এখন ভাবছেন রাস্তার ধারেই হয়তো আশ্রয় নিতে হবে।
ঈদ প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে চোখ ভেজা কণ্ঠে বেহেলা বলেন, “বাড়ি-ভিটা নদীর প্যাটত, হামার আবার ঈদ কিসের? ভাত পাই না, আবার ঈদ!”
যখন শহরে ঈদের আনন্দে মানুষ ব্যস্ত, তখন তিস্তাপাড়ের মানুষ কাটান অনিশ্চয়তায়। ঘর থাকবে কিনা, খাবার মিলবে কিনা—এসব চিন্তাই তাদের বড় বাস্তবতা। নতুন জামার আবদারে সন্তানদের মুখের দিকে তাকাতেও কষ্ট হয় বেহেলার।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা এলেই নদীভাঙনে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। রাস্তা, চিকিৎসা ও শিক্ষাব্যবস্থার সংকটও দীর্ঘদিনের।
তবু প্রতিদিন নতুন করে বাঁচার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন বেহেলা বেগমের মতো শত শত মানুষ। তিস্তার ভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করেই কাটছে তাদের জীবন।
kalprakash.com/SAS
গাইবান্ধা প্রতিনিধি 























