মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬ | ২৭ আশ্বিন, ১৪৩৩ | ১ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | দুপুর ২:৩৬:২৪
শিরোনাম
● কক্সবাজারে সুপেয় পানি প্রকল্পে আমিরাতের সহায়তা চায় সরকার ● বাংলাদেশে নতুন জঙ্গি দল, সতর্ক সরকার ● ওমানের সঙ্গে সিইপিএ চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ ● বিশ্বব্যাংকের কাছে ফের ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইছে সরকার ● ড. ইউনূসকে হেনস্তা, আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার ● এলপিজির ঘাটতি নেই, সংকট দ্রুত কাটবে: তথ্য উপদেষ্টা ● আমিরাতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে মাহ্দী আমিন-রাষ্ট্রদূতের বৈঠক ● নাটোরের বাগাতিপাড়ায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত ● বাগমারায় জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন দিবস উদযাপন ● ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জোরালো উদ্যোগ সরকারের ● কক্সবাজারে সুপেয় পানি প্রকল্পে আমিরাতের সহায়তা চায় সরকার ● বাংলাদেশে নতুন জঙ্গি দল, সতর্ক সরকার ● ওমানের সঙ্গে সিইপিএ চুক্তি করতে চায় বাংলাদেশ ● বিশ্বব্যাংকের কাছে ফের ১০ বিলিয়ন ডলার ঋণ চাইছে সরকার ● ড. ইউনূসকে হেনস্তা, আইনি ব্যবস্থা নেবে সরকার ● এলপিজির ঘাটতি নেই, সংকট দ্রুত কাটবে: তথ্য উপদেষ্টা ● আমিরাতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে মাহ্দী আমিন-রাষ্ট্রদূতের বৈঠক ● নাটোরের বাগাতিপাড়ায় আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস পালিত ● বাগমারায় জাতীয় দুর্যোগ প্রশমন দিবস উদযাপন ● ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জোরালো উদ্যোগ সরকারের

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জোরালো উদ্যোগ সরকারের

অনলাইন ডেস্ক
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১:২৪
শেয়ার: mail
ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জোরালো উদ্যোগ সরকারের

জাতীয় মাছ ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে সরকার জোরালো উদ্যোগ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, জাটকা নিধন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ, মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান জোরদার, নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা এবং গবেষণা বৃদ্ধির পাশাপাশি জেলেদের জন্য সরকারি বিশেষ বরাদ্দ ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

পাশাপাশি ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত ও নাব্যতা বজায় রাখা, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ, মোহনা ও উপকূলীয় পরিবেশের সুরক্ষা, বৈজ্ঞানিকভাবে মৎস্য আহরণ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক তথ্য ও প্রযুক্তির ব্যবহারকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁরা বলছেন, এসবের পাশাপাশি জেলেদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে তাঁদের জীবিকা ও সংরক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারলেই বাড়বে ইলিশের উৎপাদন।

মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ইকোসিস্টেম এবং ন্যাচারাল সাকসেশনের কারণে ইলিশের মতো বিভিন্ন প্রাণিজ ও উদ্ভিদ উৎপাদনে উত্থান-পতন হতে পারে। এতে বিচলিত হওয়ার কিছু নেই। সরকার ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে প্রকল্প চালু করতে যাচ্ছে। এতে আইনের প্রয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। খুব শিগগিরই প্রকল্পটি চালু হবে। একই সঙ্গে সরকার এবার ভিজিএফ কার্ড বা জেলেদের জন্য বরাদ্দের সংখ্যা বাড়িয়েছে।

ইলিশ গবেষকরা বলছেন, ভারতের গুজরাটের উৎপাদন বৃদ্ধির কারণ নির্ধারণে আরও গবেষণা এবং বাংলাদেশ-গুজরাটের নদী ও মোহনা পরিবেশের তুলনামূলক বিশ্লেষণও প্রয়োজন। এসব পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক প্রজনন ও চলাচলের পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের ইলিশসম্পদের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি হতে পারে।

মৎস্য অধিদপ্তরের ইলিশ সম্পদ ব্যবস্থাপনা শাখার উপপরিচালক মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, সরকার ইলিশ উৎপাদন বাড়াতে নতুন করে নানা উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে’র মেয়াদ শেষ হলেও নতুন করে প্রকল্প প্রণয়ন করা হয়েছে। খুব শিগগির নতুন প্রকল্প অনুমোদিত হলে এর কাজ শুরু হবে। ‘মা ইলিশ ও জাটকা সংরক্ষণের মাধ্যমে ইলিশের টেকসই উন্নয়ন প্রকল্প’ নামের এই প্রকল্পের মাধ্যমে ইলিশ উৎপাদন ও সংরক্ষণে এবার আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, কর্মসংস্থানে গুরুত্ব দেওয়া এবং ভিজিএফের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পে ভিজিএফ সুবিধা ৬ লাখ ২০ হাজার থেকে বাড়িয়ে ৬ লাখ ৪৬ হাজার করা হয়েছে।

চলতি বছরও ইলিশ আহরণ কমের দিকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, ইকোসিস্টেম এবং ন্যাচারাল সাকসেশনের কারণে ইলিশের উৎপাদন এবারও নিচের দিকে। তবে সরকারি নানা উদ্যোগের কারণে আগামী বছরগুলোয় ইলিশের উৎপাদন বাড়তে পারে বলে তিনি আশাবাদী।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ইলিশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, এটি আমাদের সবার দায়িত্ব। সম্মিলিতভাবে নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করতে পারলে ইলিশের উৎপাদন আরও বাড়বে এবং জেলেরা দীর্ঘমেয়াদে এর সুফল ভোগ করবেন।

তিনি বলেন, ইলিশ আমাদের জাতীয় সম্পদ ও জিআই পণ্য। ইলিশের প্রজনন ও উৎপাদন বাড়াতে সরকার ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা ৮ অক্টোবর থেকে ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত মোট ২২ দিন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যেকোনো মূল্যে নিষেধাজ্ঞার সময়ে ইলিশ ধরা বন্ধ করতে হবে।

শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স অনুষদের ফিশিং অ্যান্ড পোস্ট হারভেস্ট টেকনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মাসুদ রানা ইলিশের উৎপাদন কমে যাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণ দায়ী নয় বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, জাটকা আহরণ, প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা, ছোট ফাঁসের জাল ব্যবহার, নদীর নাব্য হ্রাস, পানি দূষণ, পানিপ্রবাহের পরিবর্তন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো এবং সমুদ্রে অতিরিক্ত মাছ ধরার চাপ—সব মিলিয়েই ইলিশসম্পদের ওপর চাপ তৈরি করছে।

মৎস্য অধিদপ্তরের বরাতে তিনি বলেন, দেশের মোট মাছ উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশ আসে ইলিশ থেকে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৫ দশমিক ২৯ লাখ টন, যার আনুমানিক মূল্য ২০ হাজার ৬৮০ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশে ইলিশের উৎপাদন কমে প্রায় ৫ লাখ টন হয়েছে, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। কয়েক বছর ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়ার পর সর্বশেষ হিসাবে তা কমে যাওয়ায় ইলিশসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সরকারি নথিতে শিল্প ট্রলারের জন্য ৪০ মিটার গভীরতার বাইরে মাছ ধরার বিধান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিভিন্ন সময় নির্ধারিত গভীরতা অঞ্চলের ভেতরে ট্রলিংয়ের অভিযোগ রয়েছে। সূক্ষ্ম ফাঁসের জাল বা অনুপযুক্ত জাল ব্যবহারের ক্ষেত্রে একসঙ্গে ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের মাছ ধরা পড়তে পারে। এতে ইলিশের ছোট বয়সের মাছসহ অন্যান্য মাছও প্রজননক্ষম হওয়ার আগেই আহরিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধিতে মা ইলিশ রক্ষায় কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন ড. মাসুদ রানা। তিনি বলেন, ইলিশের প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ রক্ষা করা উৎপাদন বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। একটি প্রজননক্ষম মা ইলিশ নদীতে ডিম ছাড়ার সুযোগ পেলে তার মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের বিপুলসংখ্যক ইলিশ জন্ম নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। শুধু নিষেধাজ্ঞা নয়, নদীর গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোয় টহল, নৌযান পর্যবেক্ষণ এবং নিয়মিত অভিযান চালাতে হবে। নদীতে পানি দূষণ, বর্জ্য ফেলা, নাব্য হ্রাস এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

তাঁর মতে, কোথায় ইলিশ বেশি ডিম ছাড়ছে, কোন সময় বেশি আসে এবং কোন পরিবেশগত পরিবর্তন তার প্রজননে প্রভাব ফেলছে—এসব তথ্যের ভিত্তিতে ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা করা উচিত।

স্যাটেলাইট ও জিআইএস প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের বিচরণ, প্রজনন ও নার্সারি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা, এআই ও মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে পানির তাপমাত্রা, লবণাক্ততা, নদীর প্রবাহ, ক্লোরোফিল ও অন্যান্য পরিবেশগত তথ্য বিশ্লেষণ করে ইলিশের গতিবিধি ও সম্ভাব্য সমাগমের পূর্বাভাস দেওয়া, নদী ও মোহনায় ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি) সেন্সরের মাধ্যমে পানির গুণাগুণ রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ, ডিএনএ ও হাইড্রোঅ্যাকোস্টিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ইলিশের উপস্থিতি ও মজুত নির্ণয় এবং ড্রোন ও এআইভিত্তিক নজরদারির মাধ্যমে অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।

পাশাপাশি জিপিএসভিত্তিক নৌযান পর্যবেক্ষণ, জাটকা ও মা ইলিশ রক্ষায় স্মার্ট ফিশিং গিয়ার, ডিজিটাল ক্যাচ ডেটাবেজ এবং জলবায়ু পরিবর্তনভিত্তিক পূর্বাভাসব্যবস্থা চালু করা হলে ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। এসব প্রযুক্তিকে সমন্বিত করে একটি ‘স্মার্ট হিলসা ম্যানেজমেন্ট’ গড়ে তুলতে পারলে ইলিশের প্রাকৃতিক মজুত সংরক্ষণ, অবৈধ আহরণ নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা সম্ভব।

ভারতের গুজরাট রাজ্যের নর্মদা নদীর মোহনা ও ভরুচ অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ইলিশ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা গেছে, যা বাংলাদেশের ইলিশসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। গুজরাটে উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে অতিবৃষ্টির ফলে নর্মদা নদীতে মিঠাপানির প্রবাহ বৃদ্ধি, মোহনা অঞ্চলে লবণাক্ততার পরিবর্তন, ইলিশের চলাচলের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং মৌসুমি মাছের প্রাপ্যতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গুজরাটের অভিজ্ঞতার আলোকে বাংলাদেশের ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য পদ্মা, মেঘনা, তেঁতুলিয়া ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নদী অববাহিকার স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ এবং মোহনার পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে উল্লেখ করেন ড. মাসুদ রানা।

বাংলাদেশ মেরিটাইম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক মৎস্য ও অ্যাকুয়াকালচার বিভাগের অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, দেশে ইলিশের উৎপাদন দুই বছর ধরে কমছে। ২০১৬ সালে ৩ লাখ ৯৬ হাজার টন ইলিশ উৎপাদনের মধ্য দিয়ে উত্থান শুরু হয়। এরপর প্রতি অর্থবছরে উৎপাদন ১০ থেকে ২০ হাজার টন করে বাড়ে। গত দুই বছর ধরে উৎপাদন কমের দিকে। দেশে প্রতিবছর সাড়ে ৫ থেকে ৬ লাখ টন ইলিশ আহরণ করলে সেটি টেকসই উৎপাদনের সীমার মধ্যে থাকবে।

তাঁর বিবেচনায় ইলিশের উৎপাদন কমার পেছনে সবচেয়ে বড় দুটি কারণ হলো প্রজনন মৌসুমে মা ইলিশ ধরা এবং নির্বিচার জাটকা নিধন। মা ইলিশ রক্ষার জন্য অক্টোবরে যে ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আছে, সেটি এখনো ঠিক আছে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সময়টা কিছুটা পিছিয়ে নেওয়া প্রয়োজন কি না, তা গবেষণা করে দেখা উচিত।

তিনি বলেন, অতীতে ইলিশের উৎপাদন বেড়েছিল কয়েকটি উদ্যোগের সম্মিলিত প্রভাবে। এর মধ্যে ছিল ২২ দিন মা ইলিশ রক্ষা, আট মাস জাটকা ধরা নিষিদ্ধ রাখা, মার্চ ও এপ্রিলে অভয়াশ্রমে মাছ ধরা বন্ধ রাখা, সাড়ে ৬ সেন্টিমিটারের কম ফাঁসের জাল নিষিদ্ধ করা এবং বন্ধের সময়ে জেলেদের চালসহ বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া। এ ছাড়া ২০০৫ সালে পাঁচটি অভয়াশ্রম নির্ধারণ করা হয়েছিল। অভয়াশ্রমগুলোর পুনর্মূল্যায়ন ও সীমানা পুনর্নির্ধারণ এখন জরুরি।

অধ্যাপক মো. আব্দুল ওহাব বলেন, পদ্মা-মেঘনা অববাহিকায় ইলিশ ডিম ছাড়ার পর মার্চ-এপ্রিলে জাটকা ঝাঁকে ঝাঁকে সাগরের দিকে যেতে থাকে। এ সময় নদনদীতে নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার করে এবং উপকূলীয় সাগরে আর্টিসানাল ট্রলারের (যেগুলো ৪০ মিটারের কম গভীরতায় মাছ ধরে) মাধ্যমে ব্যাপক হারে জাটকা নিধন করা হয়। এতে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায় না। জাটকা নিধনে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরামর্শ দেন তিনি সরকারকে। পাশাপাশি দখলদূষণের ফলে নদীর বাস্তুতন্ত্র নষ্ট এবং নাব্য সংকটের কারণেও ইলিশ ঠিকমতো বড় হচ্ছে না।

মৎস্যবিজ্ঞানীদের বক্তব্যের প্রতিফলন পাওয়া যায় উপকূলের জেলেদের মুখ থেকেও। বিষখালী নদীতে ইলিশ ধরা কয়েকজন জেলের নাম মো. লিটন হোসেন, মো. কাইয়ুম ও নিরু খান।

তাঁদের বক্তব্য, ইলিশের ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পরই ছাঁকনির মতো সূক্ষ্ম জাল দিয়ে সেগুলো ধরে ফেলা হয়। জাটকা নিধনের প্রথম ধাপে একেবারে ছোট বাচ্চা, যা স্থানীয়ভাবে ‘চাপিলা মাছ’ নামে বাজারে বিক্রি হয়, পরে তুলনামূলক বড় ফাঁসের কারেন্ট জালে নির্বিচারে ধরা হয়। শেষ ধাপে বড় ট্রলিং ট্রলার এবং কাঠের রূপান্তরিত ট্রলিং ট্রলারে ব্যবহৃত নিষিদ্ধ বেহুন্দি জালে ঝাঁকে ঝাঁকে ধরা হয়। এতে ইলিশ পূর্ণ আকারে বেড়ে ওঠার সুযোগই পাচ্ছে না। চাঁদপুরের পদ্মা-মেঘনা ছাড়াও নোয়াখালীর হাতিয়া, ভোলাসহ দক্ষিণাঞ্চল থেকে জেলেরা ছোট ইলিশ ধরে আনছেন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় উঠে এসেছে, ইলিশের খাদ্যতালিকায় ২৭ প্রজাতির উদ্ভিদকণা (জুপ্ল্যাংকটন) ও ১২ প্রজাতির প্রাণিকণা (ফাইটোপ্ল্যাংকটন) রয়েছে। এসব প্ল্যাংকটনের পরিমাণ মেঘনা নদীতে ৬৮ শতাংশ কমেছে। এর বড় কারণ নদীদূষণ। ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুল আলম এক গবেষণায় দেখিয়েছেন, পদ্মা ও মেঘনার মোহনায় ইলিশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য প্ল্যাংকটন আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসছে, যার প্রভাব পড়ছে ইলিশের আকৃতিতেও।

উল্লেখ্য, ইলিশ শুধু জাতীয় অর্থনীতির জন্য নয়, উপকূলীয় জেলে, মৎস্যনির্ভর জনগোষ্ঠী এবং উপকূলের সাধারণ মানুষের জীবিকার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে প্রায় ছয় লাখ মানুষ সরাসরি ইলিশ আহরণে নিয়োজিত। আর পরিবহন, বাজারজাতকরণ, জাল ও নৌকা তৈরি, বরফ উৎপাদন এবং প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা কার্যক্রমে আরও প্রায় ২০ থেকে ২৫ লাখ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছেন।

ইলিশে উচ্চমাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড, প্রোটিন, ভিটামিন ও খনিজ রয়েছে, যা মানবদেহের জন্য অপরিহার্য। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড স্টেট অব ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২৪’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিঠা পানির মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। একই সঙ্গে চাষ করা মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ পঞ্চম স্থানে এবং ইলিশ আহরণে প্রথম স্থানে রয়েছে। এ ছাড়া ২০১৭ সালের ১৭ আগস্ট ইলিশ মাছকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়, যা বাংলাদেশের জন্য গৌরবের বিষয়।

সূত্র: বাসস

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬ | Globe kalprakash.com

ইলিশের উৎপাদন বাড়াতে জোরালো উদ্যোগ সরকারের

বিস্তারিত কমেন্টে