ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে ঢাকা ও নয়াদিল্লির কূটনৈতিক সম্পর্কে চরম টানাপোড়েন ও অস্বস্তি ঘনীভূত হচ্ছে। গত দুই বছরে দিল্লি তাঁর বিষয়ে নানা অবস্থান গ্রহণ করলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি নিউজ বাংলা ও অনলাইন সাময়িকী ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর পৃথক দুটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে— শেখ হাসিনা এখন ভারতের কাছে একটি বড় কূটনৈতিক ‘বোঝা’ বা ‘লায়াবিলিটি’তে পরিণত হয়েছেন।
বিবিসি নিউজ বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০২৪ সালের আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনাকে ভারত সরকার ‘নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাময়িক আশ্রয়’ দিলেও সেই অবস্থান দুই বছর অতিক্রম করায় ভারতের অসন্তোষ ও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। বিশেষ করে গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব’ (এফসিসি)-এ তাঁর এক বিতর্কিত অনলাইন সংবাদ সম্মেলন ও ভারত সরকারের প্রচ্ছন্ন সায় নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থানকালীন নিজেকে ‘ইনডিভিজুয়াল ক্যাপাসিটি’ বা ব্যক্তিগত পরিচয়ে রাজনৈতিক কার্যক্রম চালাচ্ছেন বলে দাবি করলেও ঢাকার দাবি— এটি ভারতের সম্মতি ও সমর্থন ছাড়া সম্ভব নয়।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে নির্বিচারে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশের আদালতে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া সাজাপ্রাপ্ত এই আসামিকে বাংলাদেশ সরকার বারবার ফেরত চাইলেও ভারত নীরব ভূমিকা পালন করছে। এতে গঙ্গা চুক্তি থেকে শুরু করে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যিক সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা থমকে গেছে। ভারতের শীর্ষ কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে ‘রাষ্ট্রীয় অতিথি’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে বিধি-নিষেধ আরোপ না করলেও, দিল্লিতে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারতের ইতিহাসে দালাই লামার মতো রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীরা কৌশলী ভূমিকা রাখলেও শেখ হাসিনা ভারতের কোনো কাজে না এসে উল্টো ভারতের জন্য বিশাল আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক জিওপলিটিক্যাল দায় হয়ে উঠেছেন।
অন্যদিকে, ‘দ্য ডিপ্লোম্যাট’-এর বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লিতে আয়োজিত শেখ হাসিনার সর্বশেষ সংবাদ সম্মেলনকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন চরম রূপ নিয়েছে। উক্ত অনুষ্ঠানে ভারত সরকারের সরাসরি সায় ছিল বলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা মনে করছেন। এতে অংশ নেওয়া ও ক্রিকেটের মাঠ থেকে লাইভে যুক্ত হওয়া ক্রিকেটার সাকিব আল হাসানের ভূমিকা নিয়েও ভারতে জোর আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনটির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কড়া এক বিবৃতি জারি করে। ঢাকা স্পষ্ট জানায়, ভারতের মাটিতে বিতর্কিত এই সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্বের প্রতি চরম অবমাননা এবং ‘জুলাই বিপ্লবের শহীদদের প্রতি গুরুতর অপমান’। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আবারও হাসিনাকে বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে বাংলাদেশে হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক দাবি জানিয়েছে।
দ্য ডিপ্লোম্যাট তাদের বিশ্লেষণে লিখেছে, হাসিনাকে বলপ্রয়োগ করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো ভারতের জন্য বেশ জটিল। তবে তিনি যদি স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতেন, তবে দুই দেশের মধ্যে তৈরি হওয়া স্নায়ুযুদ্ধ অনেকটাই প্রশমিত হতে পারত। অন্যদিকে, জল্পনা রয়েছে— শেখ হাসিনাকে নিরাপদে অন্য কোনো ইউরোপীয় দেশে স্থানান্তরের জন্য ভারত পর্দার আড়ালে আন্তর্জাতিক শক্তির সাথে আলোচনা চালাচ্ছ, যদিও ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে এসব বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
kalprakash.com/IM