নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের অধীনে দায়ের করা মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো চেকের অর্থ আদায় নিশ্চিত করা, চেকদাতাকে (আসামি) কারাগারে পাঠানো নয়—এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়ে রায় ঘোষণা করেছেন হাইকোর্ট। রায়ে আদালত স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এনআই অ্যাক্টের মামলায় কারাদণ্ড প্রদান কেবল উপযুক্ত ও বিশেষ পরিস্থিথিতেই করা উচিত।
‘মো. আলাউদ্দিন বনাম রাষ্ট্র এবং অন্যান্য’ মামলার রিভিশন আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি ড. মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২২ জুলাই এই রায় দেন। রায়টির পূর্ণাঙ্গ ও লিখিত অনুলিপি বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে আসামির অর্থদণ্ড বহাল রেখে বিচারিক আদালত কর্তৃক প্রদত্ত কারাদণ্ড বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট।
আদালতে আসামি পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আইনজীবী মো. সাইফুল আলম এবং ঋণ প্রদানকারীর (বাদী) পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী দেব দুলাল বড়াল। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সফিকুল ইসলাম এবং সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ফারহানা আবেদীন, হেমায়েত উদ্দিন ও কে এম সাইফুল ইসলাম।
রায়ে উচ্চ আদালত ‘আমান উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র’ মামলার নজির উল্লেখ করে বলেন, “এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার বিচারে কারাদণ্ড প্রদান করা একটি অতি কঠোর সাজা, যা থেকে প্রকৃত শাস্তিমূলক উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। ওই পর্যবেক্ষণ ও নীতির সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত পোষণ করছি।”
মামলার প্রেক্ষাপট: মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, গবাদিপশুর ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসামি মো. আলাউদ্দিন বাদীর কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। ঋণের বিপরীতে তিনি রূপালী ব্যাংক লিমিটেডের বরিশাল বাজার রোড শাখার একটি চেক প্রদান করেন। ২০২০ সালের ২ নভেম্বর চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে অপর্যাপ্ত তহবিলের কারণে ডিজঅনার হয়। পরবর্তী সময়ে আইনি নোটিশের নির্ধারিত মেয়াদে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর বরিশালের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এনআই অ্যাক্টে মামলা দায়ের করেন বাদী।
আদালত মামলাটি বিচারে পাঠালে ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর বরিশাল তৃতীয় যুগ্ম দায়রা জজ আদালত আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন। বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি ওই আদালত আসামি আলাউদ্দিনকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ৬ মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং চেকের সমপরিমাণ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড দেন।
পরবর্তীতে অর্থদণ্ডের অর্ধেক (২ লাখ ৫০ হাজার টাকা) জমা দিয়ে জেলা দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন আলাউদ্দিন। আপিল আদালত ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বিচারিক আদালতের সাজা বহাল রাখেন। এ রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন আলাউদ্দিন।
হাইকোর্ট উভয়পক্ষের শুনানি শেষে আসামি আলাউদ্দিনের সাজার অংশ সংশোধন করে মূল কারাদণ্ড বাতিল ঘোষণা করেন এবং অর্থদণ্ড বহাল রাখেন। রায়ের কপি প্রাপ্তির তিন মাসের মধ্যে আসামিকে চেকের অবশিষ্টাংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ করার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত। অনাদায়ে আসামিকে দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে সাজা ভোগ করলেও তিনি বকেয়া অর্থ পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন না এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারা অনুযায়ী উক্ত অর্থ আদায় করা হবে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
kalprakash.com/IM