খাতা-কলমে হয়ত সেনেগাল এখন আর ‘আফ্রিকা সেরা’ নয়। কনফেডারেশন অব আফ্রিকান ফুটবলের (CAF) নথিতে তাদের নামের পাশে এখন জ্বলজ্বল করছে ‘বাজেয়াপ্ত’ শব্দটি। কিন্তু মাঠের ঘাম আর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত শ্রেষ্ঠত্ব কি শুধুমাত্র একটি দাপ্তরিক আদেশে মুছে ফেলা যায়? সেনেগালের ফুটবলাররা অন্তত তা বিশ্বাস করেন না। তাইতো কেড়ে নেওয়া সেই সোনালি ট্রফিটি বগলে করেই প্যারিসের মাঠে এক অভূতপূর্ব বিদ্রোহের গল্প লিখলেন সাদিও মানে আর কুলিবালিরা।
শনিবার (২৮ মার্চ ) ফ্রান্সের স্তাদ দ্য ফ্রান্সে পেরুর বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ ছিল সেনেগালের। কিন্তু ম্যাচ ছাপিয়ে সব আলো কেড়ে নিলেন ‘তেরাঙ্গার সিংহরা’। গ্যালারি ভর্তি হাজার হাজার প্রবাসী সেনেগালিজ ভক্তদের চিৎকারের মাঝে ট্রফি হাতে নিয়ে ল্যাপ অব অনারে অংশ নেন ফুটবলাররা। অধিনায়ক কুলিবালির নেতৃত্বে পুরো দল যখন মাঠ প্রদক্ষিণ করছিল, গোলরক্ষক এদুয়ার্দ মেন্ডি তখন পরম মমতায় শিরোপাটি উঁচিয়ে ধরেছিলেন আকাশের পানে। সিএএফ-এর বিতর্কিত রায় এর মাত্র ১০ দিনের মাথায় এই উদযাপন যেন বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর প্রতি এক নীরব কিন্তু শক্ত জবাব।
পুরো সংকটের মূলে রয়েছে রাবাতে অনুষ্ঠিত আফকন ফাইনালের সেই রুদ্ধশ্বাস ১৭ মিনিট। স্বাগতিক মরক্কোর পক্ষে ভিএআর (VAR)-এর একটি বিতর্কিত পেনালটি সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কোচ পাপে থিয়াওয়ের নির্দেশে মাঠ ছাড়েন সেনেগালের ফুটবলাররা। দীর্ঘ ১৭ মিনিট খেলা বন্ধ থাকার পর সাদিও মানের প্রচেষ্টায় তারা মাঠে ফেরেন এবং ১-০ গোলে জয় নিশ্চিত করেন। কিন্তু সিএএফ-এর আপিল বোর্ড পরবর্তীতে সেই সাময়িক বিরতিকে ‘ওয়াক ওভার’ হিসেবে গণ্য করে মরক্কোকে ৩-০ গোলে জয়ী ঘোষণা করে। মাঠের জয় টেবিলের সিদ্ধান্তে ধূলিসাৎ হয়ে যায়।
সেনেগাল ফুটবল ফেডারেশন (FSF) এই ঘটনাকে ফুটবল ইতিহাসের ‘সবচেয়ে বড় প্রশাসনিক ডাকাতি’ বলে অভিহিত করেছে। তাদের প্রতিবাদ শুধু মাঠের উদযাপনেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, পেরুর বিপক্ষে ম্যাচে সেনেগালের খেলোয়াড়দের জার্সিতে দেখা গেছে ‘দুইটি তারকা’। অর্থাৎ, দাপ্তরিকভাবে একটি শিরোপা কেড়ে নেওয়া হলেও ফুটবলাররা তাদের হৃদয়ে দ্বিতীয় শিরোপাটি খোদাই করে নিয়েছেন। ফেডারেশন সভাপতি আব্দুল্লায়ে স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাদের খেলোয়াড়দের সম্মানের প্রশ্নে কোনো আপোশ করা হবে না।
এরই মধ্যে সুইজারল্যান্ডের আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে (CAS) ন্যায়বিচারের আশায় কড়া নেড়েছে সেনেগাল। আইনি প্রক্রিয়া হয়ত কয়েক মাস চলবে, কিন্তু সেনেগাল সরকার এরই মধ্যে সিএএফ-এর ভেতরে কোনো ‘দুর্নীতি’ কাজ করেছে কি না, তা নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবি তুলেছে।
প্যারিসের স্তাদ দ্য ফ্রান্স শনিবার এক অন্যরকম সত্যের সাক্ষী হলো। আদালত বা ফুটবল সংস্থা যা-ই বলুক না কেন, সেনেগালের মানুষ এবং তাদের বীর ফুটবলাররা মনে করেন— আফ্রিকার আসল রাজা তারাই। এখন দেখার বিষয়, আইনি টেবিলের যুদ্ধে ‘তেরাঙ্গার সিংহরা’ তাদের ছিনিয়ে নেওয়া রাজমুকুট শেষ পর্যন্ত উদ্ধার করতে পারে কি না।
সূত্র : গোল ডট কম
স্পোর্টস ডেস্ক 



















