আল্লাহ তাআলা বলেন, সাত আকাশ, পৃথিবী এবং এগুলোর মধ্যে যা কিছু আছে, সবই তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে। এমন কিছু নেই, যা তাঁর প্রশংসাসহ পবিত্রতা ঘোষণা করে না। কিন্তু মানুষ তাদের তাসবিহ বুঝতে পারে না। নিশ্চয়ই তিনি অত্যন্ত সহনশীল, পরম ক্ষমাশীল। (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৪৪)
এটি একটি মহান আয়াত। যে ব্যক্তি এই আয়াত নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করবে, সে উপলব্ধি করতে পারবে যে সমগ্র সৃষ্টিজগৎ তার রবের প্রশংসাসহ তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করে। মানুষ, গাছপালা, নক্ষত্র—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে চিন্তার বিষয় হলো, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, তোমরা তাদের তাসবিহ বুঝতে পারো না। তিনি বলেননি, তোমরা তাদের তাসবিহ শুনতে পাও না। তাহলে কি এমন হতে পারে যে আমরা সৃষ্টিজগতের তাসবিহের শব্দ শুনতে পাই, কিন্তু তার অর্থ বুঝতে পারি না? কারণ, কোনো কথা শোনার পরই তা বোঝার বিষয়টি আসে।
অন্যভাবে বললে, আমরা যদি কাউকে বলি, তুমি আমাদের কথা বুঝতে পারছ না, তাহলে এর অর্থ হতে পারে—আমরা তার সামনে কথা বলছি, সে আমাদের কথা শুনছেও, কিন্তু আমরা কী বলছি, তা বুঝতে পারছে না।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে লেখক ধারণা করেছেন, পবিত্র এই আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আমাদের চারপাশের সবকিছু থেকে নির্গত তাসবিহের শব্দ আমরা শুনতে পারলেও সেগুলোর অর্থ উপলব্ধি করতে পারি না।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা এমন কিছু বিষয় আবিষ্কার করছেন, যেগুলো নিয়ে এই ভাবনাকে আরও গভীরভাবে বিবেচনা করা যায়।
উদ্ভিদের শব্দ
বিজ্ঞানীরা লক্ষ করেছেন, কিছু উদ্ভিদ থেকে এমন শব্দতরঙ্গ নির্গত হয়, যা মানুষের শ্রবণসীমার মধ্যে পড়তে পারে। প্রতি সেকেন্ডে ২০ থেকে ২০ হাজার কম্পাঙ্কের শব্দ মানুষের শ্রবণযোগ্য সীমার অন্তর্ভুক্ত।
তবে উদ্ভিদ থেকে নির্গত কিছু সংকেত এতটাই দুর্বল হতে পারে যে সেগুলো সরাসরি শোনা যায় না; যন্ত্রের সাহায্যে সেগুলোকে বিবর্ধিত করতে হয়।
নক্ষত্র ও কৃষ্ণগহ্বরের শব্দ
বিজ্ঞানীরা কিছু নক্ষত্র ও মহাজাগতিক বস্তুর সঙ্গে সম্পর্কিত শব্দসংকেত শনাক্ত করেছেন। নিউট্রন নক্ষত্র থেকে আসা সংকেতকে কখনো হাতুড়ির আঘাতের মতো শব্দ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। কৃষ্ণগহ্বরের সঙ্গেও শব্দের ধারণা যুক্ত হয়েছে। এমনকি মহাবিশ্বের প্রাথমিক পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত সংকেত থেকেও বিজ্ঞানীরা শব্দের অনুরূপ উপস্থাপনা তৈরি করেছেন।
জীবন্ত কোষের শব্দ
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক গিমজেউস্কির (Gimzewski) মতে, বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে জীবন্ত কোষের কম্পন শনাক্ত করা সম্ভব। বিভিন্ন কোষের কম্পনের বৈশিষ্ট্যও ভিন্ন হতে পারে। বিশেষ করে হৃদ্যন্ত্রের কোষের কম্পন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।
প্রাণী, পোকামাকড় ও অণুজীবের শব্দ
ডলফিন, ঝিঁঝিঁ পোকা, পাখি, মৌমাছি এবং অন্যান্য জীব বিভিন্ন ধরনের শব্দ বা কম্পন তৈরি করে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞান হয়তো পরমাণুর কম্পন সম্পর্কেও আরও নতুন তথ্য আবিষ্কার করবে। তখন সৃষ্টিজগতের সবকিছু আল্লাহর তাসবিহ করে—কোরআনের এই বক্তব্যের তাৎপর্য আরও গভীরভাবে অনুধাবন করা সম্ভব হতে পারে।
সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তুর নিজস্ব বৈশিষ্ট্য
আধুনিক বিজ্ঞানীরা মনে করেন, মহাবিশ্বের প্রতিটি বস্তুর নিজস্ব কম্পন বা বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তাহলে এমন কোনো অদৃশ্য শক্তি কি নেই, যা সর্বত্র বিদ্যমান এবং আমরা যা দেখি বা অনুভব করি, তার ওপর প্রভাব বিস্তার করে? সেই শক্তি কি মহাবিশ্বের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলার ক্ষমতা হতে পারে না? আর এসব শব্দ বা কম্পন কি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাঁর মহিমা ঘোষণা এবং তাঁর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে না?
কেন আল্লাহর তাসবিহ থেকে উদাসীন থাকব?
যদি সৃষ্টিজগতের সবকিছু রাত-দিন আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে, ক্লান্ত না হয়ে এবং বিরতি না দিয়ে, তাহলে আমরা কেন আল্লাহর স্মরণ থেকে উদাসীন থাকব? যদি এমন ক্ষুদ্র জীবও আল্লাহর তাসবিহ পাঠ করে, যাকে খালি চোখে দেখা যায় না, তাহলে আমরা—যারা নিজেদের মুমিন বলে দাবি করি—আমাদের কি আরও বেশি তাসবিহ করা উচিত নয়?
(মাওসুআতুল ইজাজিল ইলমি ফিল কোরআনি ওয়াস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ অবলম্বনে)
kalprakash.com/IM