পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে চলমান উত্তেজনার মধ্যে রাশিয়ার অবস্থান নিয়ে কঠোর বার্তা দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তিনি বলেছেন, রাশিয়ার ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা হলে দেশটি হাতে থাকা সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করবে। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের মতো দেশগুলোর পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কেও রাশিয়া অবগত বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার রাশিয়ার ভালদাই বৈদেশিক নীতি ফোরামে দেওয়া দীর্ঘ বক্তব্যে পুতিন এসব কথা বলেন।
চলতি সপ্তাহে রাশিয়া অভিযোগ করে আসছে, ন্যাটো কালিনিনগ্রাদকে অবরুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। লিথুয়ানিয়া ও পোল্যান্ডের সীমান্তবর্তী এই রুশ ভূখণ্ডকে মূল রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো চেষ্টা হলে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে মস্কো।
তবে ন্যাটো বলেছে, তারা একটি প্রতিরক্ষামূলক জোট। একই সঙ্গে মস্কোকে পারমাণবিক হুমকি দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে জোটটি।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পশ্চিমা মিত্ররা রাশিয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের হাইব্রিড যুদ্ধের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছে। বিশেষ করে পোল্যান্ড ও বাল্টিক অঞ্চলে এ ধরনের ঘটনার সংখ্যা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত সপ্তাহে পোল্যান্ড জানিয়েছে, কালিনিনগ্রাদের কাছাকাছি তাদের আকাশসীমায় একটি রুশ হেলিকপ্টার প্রবেশ করেছিল। লিথুয়ানিয়াও বলেছে, রাশিয়ার কর্মকাণ্ডের কারণে দেশটির জনগণের মধ্যে নিয়মিত হুমকির অনুভূতি তৈরি হয়েছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেশটির আকাশসীমায় রুশ ড্রোন প্রবেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেরৎস বৃহস্পতিবার বলেছেন, তাঁর দেশ আরও হাইব্রিড হামলার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে, যার মধ্যে গুরুতর হামলাও থাকতে পারে। গত আগস্টে লাইপজিগ বিমানবন্দরের একটি রানওয়ের কাছে বিস্ফোরক বহনকারী একটি ড্রোন পাওয়ার পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে পুতিনের বক্তব্য
ভালদাই ফোরামে পুতিন বলেন, আন্তর্জাতিক সংঘাত আরও দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে। তবে পশ্চিমা আধিপত্য দুর্বল হওয়ার সঙ্গে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তিনি মনে করেন।
২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পরও পুতিন এ যুদ্ধের জন্য পশ্চিমাদের দায়ী করেন। তাঁর দাবি, রাশিয়াকে উসকানি দেওয়া হয়েছিল এবং নিজেদের নিরাপত্তা রক্ষায় মস্কোকে অস্ত্র হাতে নিতে বাধ্য করা হয়েছে।
ইউক্রেনের অর্থনৈতিক স্থাপনায় রাশিয়ার হামলাকে রুশ তেল শোধনাগার ও কৃষ্ণসাগরে রুশ জাহাজে হামলার জবাব হিসেবে বর্ণনা করেন পুতিন। তিনি বলেন, এখন সবাই যুদ্ধ থামানোর কথা বলছে, কিন্তু সংঘাত শুরুর জন্য পশ্চিমাদেরই দায়ী করেন তিনি।
ইউক্রেন রাশিয়ার তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়ে কিছুটা সফল হয়েছে বলেও স্বীকার করেন পুতিন। তাঁর দাবি, এসব হামলার কারণে রাশিয়ার মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় ১ শতাংশ কমেছে।
ইউক্রেনের দাবি, রাশিয়ার তেল অবকাঠামোতে হামলার অন্যতম কারণ হলো এসব স্থাপনা থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে রাশিয়া যুদ্ধের ব্যয় নির্বাহ করে।
২০২২ সালে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রতি শীতেই ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোতে রাশিয়ার হামলা বেড়েছে। দেশটির অন্যান্য বেসামরিক অবকাঠামোতেও হামলার অভিযোগ রয়েছে। বৃহস্পতিবার কিয়েভের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুতেও ড্রোন হামলা হয়েছে।
কালিনিনগ্রাদ নিয়ে উত্তেজনা
পুতিন পশ্চিমাদের বিরুদ্ধে একাধিক সংঘাত উসকে দেওয়ার অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, রুশ ভূখণ্ডে সরাসরি হামলা হলে, তা কালিনিনগ্রাদ বা অন্য কোনো ভূখণ্ডেই হোক, রাশিয়ার হাতে থাকা সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি সামনে আসবে।
কালিনিনগ্রাদকে ঘিরে বাল্টিক সাগরে ন্যাটো নৌ মহড়া চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন পুতিন। তাঁর দাবি, এসব কার্যক্রম কালিনিনগ্রাদের জন্য গুরুতর হুমকি তৈরি করছে।
পশ্চিমারা কালিনিনগ্রাদকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা করলে পারমাণবিক অস্ত্রসহ রাশিয়ার হাতে থাকা সব ধরনের শক্তি ও উপায় ব্যবহারের জন্য মস্কো প্রস্তুত থাকবে বলেও জানান তিনি।
তবে পুতিন বলেন, রাশিয়া কাউকে হুমকি দিচ্ছে না এবং ২০২৯, ২০৩০ বা ২০৫০ সালে কোনো দেশ আক্রমণের পরিকল্পনাও নেই। তবে রাশিয়া আগ্রাসনের মুখে পড়লে জবাব দেবে বলে সতর্ক করেন তিনি।
যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের পারমাণবিক সক্ষমতা সম্পর্কে রাশিয়া অবগত বলেও মন্তব্য করেন পুতিন। তবে রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডারের সঙ্গে অন্য কোনো দেশের অস্ত্রের তুলনা চলে না বলে দাবি করেন তিনি।
ন্যাটোর বক্তব্য
পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দীর্ঘদিনের আশঙ্কা, কালিনিনগ্রাদে সরাসরি হামলা না চালিয়ে রাশিয়া মিত্র বেলারুশের সঙ্গে কালিনিনগ্রাদের মধ্যকার সুওয়ালকি গ্যাপ নামে পরিচিত সরু স্থলপথ ব্যবহার করে লিথুয়ানিয়ার ভূখণ্ড দখলের চেষ্টা করতে পারে।
গত সপ্তাহে লিথুয়ানিয়ার প্রধানমন্ত্রী বিবিসিকে বলেছেন, রাশিয়া হামলা চালালে কীভাবে জনগণকে সরিয়ে নেওয়া হবে, সে পরিকল্পনা দেশটি তৈরি করেছে। লিথুয়ানিয়ায় ন্যাটোর হাজার হাজার সেনাও মোতায়েন রয়েছে।
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে বুধবার বলেছেন, জোটের কোনো মহড়া বা কার্যক্রমই মস্কোর জন্য হুমকি নয়। ক্রেমলিনের এ ধরনের বক্তব্যকে তিনি অপ্রয়োজনীয় ও সহায়ক নয় বলে মন্তব্য করেন।
পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে সতর্কতা
পুতিন বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর হাতে থাকা এমন অস্ত্র নিয়েও কথা বলেন, যেগুলো পৃথিবীর সব প্রাণ ধ্বংস করে দিতে পারে অথবা বিশ্বকে ভয়াবহ বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
এসব অস্ত্র কখনো ব্যবহার করা হবে না, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে মঞ্চে রাখা বন্দুকের উদাহরণ টেনে পুতিন বলেন, কোনো নাটকের শুরুতে মঞ্চে বন্দুক দেখা গেলে নাটকের শেষদিকে সেটি ব্যবহৃত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
যুদ্ধের নিয়মকানুন নতুন করে নির্ধারণের আহ্বানও জানান তিনি। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারণে যুদ্ধের ঝুঁকি বাড়ছে বলে সতর্ক করেন রুশ প্রেসিডেন্ট।
তাঁর ভাষায়, যুদ্ধের স্বয়ংক্রিয়করণ ও ডিজিটালাইজেশনের ফলে যুদ্ধ অনেকটা খেলায় পরিণত হচ্ছে। এর মাধ্যমে মানবতা অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে এবং আবারও বর্বরতার দিকে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
kalprakash.com/IM