দেশব্যাপী হাম ও রুবেলা টিকাদান কর্মসূচির আওতায় এখন পর্যন্ত ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ শিশুকে সফলভাবে টিকার আওতায় আনা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। শনিবার দেশব্যাপী বিশেষ হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান। একই সঙ্গে বাদ পড়া শিশু ও নতুন জন্ম নেওয়া শিশুদের সুরক্ষায় ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে নতুন একটি জোরদার কর্মসূচি শুরুর ঘোষণা দেন তিনি। তিনি জানান, টিকা সংগ্রহে আগের নীতিগত ভুলের কারণে চার বছর বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছিল।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় একটি সরকারকে সবসময় সচেতন থাকতে হয়। ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বরের পর প্রতি চার বছরে একবার ব্যাপকহারে এসব মহামারির বিরুদ্ধে টিকাদান কর্মসূচি চালুর দায়িত্ব সরকারের ছিল। কিন্তু ২০২০ সালের পর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত এই কর্মসূচি বন্ধ ছিল।
তিনি বলেন, টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ইউনিসেফের ডেলিগেটেড ওয়েতে সরাসরি কেনাকাটার পরিবর্তে আগের সরকার ওপেন টেন্ডার ব্যবস্থায় যেতে চেয়েছিল। বিদেশি সংস্থাগুলো এ বিষয়ে একাধিকবার অনুরোধ করলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি, ফলে সময়ক্ষেপণ হয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট চার বছরের ঘাটতির খেসারত দায়িত্ব নেওয়ার পর বর্তমান সরকারকে দিতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এই পরিস্থিতিতে দেশের অনেক মাকে কষ্ট পেতে হয়েছে এবং অনেক মায়ের বুক খালি হয়েছে। তিনি জানান, ১ কোটি ৮৫ লাখ ৮৩৩ জন রোগীর মধ্যে প্রায় এক হাজার শিশু মারা গেছে। একটি শিশুর মৃত্যুও অত্যন্ত দুঃখজনক উল্লেখ করে তিনি বলেন, একটি মায়ের বুক খালি হয়ে যাওয়া তার জন্যও অত্যন্ত কষ্টের।
তিনি জানান, দায়িত্ব গ্রহণের পর ৫ এপ্রিল থেকে টিকাদান কর্মসূচি শুরু করা হয়। প্রথম পর্যায়ে ইউনিসেফ নির্ধারিত তিনটি পর্যায়ে ১৮টি জেলায় কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। পরবর্তী পর্যায়ে ঢাকাসহ আরও দুটি বড় সিটি করপোরেশনকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরপর ৪ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কর্মসূচি এগিয়ে এনে ২০ এপ্রিল থেকে সারা দেশে টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়, যাতে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি হাম আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে পুষ্টির ঘাটতিও দেখা গেছে। চিকিৎসকদের মতে, হাম আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ নিউমোনিয়া এবং তার সঙ্গে থাকা অপুষ্টি। পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে অনেক শিশুর হাম হলে তা দ্রুত নিউমোনিয়ায় রূপ নিচ্ছে এবং গুরুতর অবস্থায় ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবেশে সমস্যা হচ্ছে।
এ পরিস্থিতিতে আইসিডিডিআরবির চিকিৎসক চিশতি মাত্র ১৫০ টাকা খরচে একটি বোতলভিত্তিক সিপ্যাপ ব্যবস্থা উদ্ভাবন করেছেন বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, স্বাভাবিকভাবে অক্সিজেন নিতে না পারা শিশুদের এই পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থা করায় অনেক শিশুকে রক্ষা করা সম্ভব হয়েছে।
দেশের চিকিৎসকদের প্রশংসা করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন মহামারি ও জরুরি পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চিকিৎসকেরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। করোনার সময়ও চিকিৎসকদের অক্লান্ত পরিশ্রম ও ত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়ায় হাম দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। হাম অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আক্রান্ত শিশুর কাছাকাছি অন্য শিশুরা থাকলে তাদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। একই বিছানায় একাধিক শিশু থাকা কিংবা আক্রান্তের কাছাকাছি যাতায়াতের মাধ্যমেও সংক্রমণ হতে পারে বলে তিনি জানান।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, ভিটামিন এ ক্যাপসুল কর্মসূচিতে ২ কোটি ২৫ লাখ শিশুকে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচিতে ১ কোটি ৮৫ লাখ শিশু টিকা পেয়েছিল। দুই কর্মসূচির মধ্যে প্রায় ৪০ লাখ শিশুর এই ব্যবধান বিবেচনায় নিয়ে নতুন করে শিশুদের খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে আগের ক্যাম্পেইন বন্ধ হওয়ার পরদিন থেকে ঈদুল আজহার পরদিন পর্যন্ত আরও প্রায় ১৪ লাখ শিশুকে খুঁজে টিকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তবে এরপরও হাম পুরোপুরি বন্ধ না হওয়ায় নতুন করে টিকাদান কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে জানিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ইউনিসেফ ১০ দিনের মধ্যে আরও ৪০ লাখ ডোজ টিকা সরবরাহ করেছে। আগের কিছু মজুতের সঙ্গে নতুন টিকা মিলিয়ে এবার ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে ক্যাচআপ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে, যার মধ্যে ১০ লাখ নতুন জন্ম নেওয়া শিশু এবং বাকি ২৪ লাখ আগে বাদ পড়া শিশু রয়েছে।
তিনি বলেন, আজ থেকে সারা দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে ক্যাম্প এবং প্রতিটি উপজেলায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, সিভিল সার্জন, ইউএনও ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে আগের চেয়েও জোরদারভাবে টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। কর্মসূচিটি সফল করতে গণমাধ্যমের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, অনেক মা কর্মজীবী হওয়ায় দিনের বেলায় সন্তানকে নিয়ে টিকাদান কেন্দ্রে আসতে পারেন না। এ বিষয় বিবেচনায় রেখে ছুটির দিনেও টিকাদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং সন্ধ্যার পরও টিকাদান কার্যক্রম চলবে বলে তিনি জানান। ছয় থেকে ৫৯ মাস বয়সী সব শিশুকে এই ক্যাম্পেইনের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, এই টিকাদান কর্মসূচির পরও প্রায় ১০ লাখ ডোজ টিকা মজুত থাকবে। ইতিমধ্যে ৪৩ লাখ ডোজ টিকা বিভিন্ন উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে এবং পরবর্তী মপআপ কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার জন্যও টিকা সংরক্ষণ করা হচ্ছে।
kalprakash.com/IM