কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের ছেলে ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম (১৩) নিখোঁজ হওয়ার পর তার বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের কাছে সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনের বিষয়ে প্রথম তথ্য দেন মোজাম্মেল হোসেন ফাহাদ। শুধু তথ্য দেওয়াই নয়, অপ্রতিমকে খুঁজে বের করতেও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে সহযোগিতা করেন তিনি। এ কারণে শুরুতে অপ্রতিমের পরিবার ফাহাদকে সন্দেহের বাইরে রেখেছিল।
অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর রাতে তিনি ফাহাদকে ফোন করে অপ্রতিমকে দেখেছেন কি না জানতে চান। তখন ফাহাদ জানান, অপ্রতিমের সঙ্গে তার দেখা হয়নি। তবে তুহিন নামে একজনের কথা বলেন এবং জানান, তুহিন অপ্রতিমের পরিচিত।
ফিরোজ শাহরিয়ারের ভাষ্য, পরে ফাহাদ তুহিনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন এবং অপ্রতিমকে খুঁজে পেতে বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেন। এমনকি তাদের একটি গ্রুপেও অপ্রতিমকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে বার্তা দেওয়া হয়। ফলে সে সময় পরিবারের কাছে ফাহাদকে সহযোগী হিসেবেই মনে হয়েছিল।
সিসিটিভিতে তুহিনকে শনাক্ত করেন ফাহাদ
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অপ্রতিমকে বাঁশের লাঠি দিয়ে প্রথমে আঘাত করেন হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯)। এরপর ফাহাদ এবং পরে মো. কামরুল হাসান (১৬) তাকে আঘাত করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, তুহিন, ফাহাদ ও কামরুল আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডে নিজেদের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেছেন। পুলিশের দাবি, তাদের বক্তব্য অনুযায়ী অপ্রতিমের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াকে কেন্দ্র করেই হত্যাকাণ্ড ঘটে।
অপ্রতিমের বাবাও মনে করছেন, আইফোন ছিনিয়ে নেওয়াই হত্যার মূল কারণ। তবে এ ঘটনায় নির্দোষ কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন, সেটিও নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তিনি।
দুই সপ্তাহ আগে কাজে যোগ দেন ফাহাদ
অপ্রতিমের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের আগে ফাহাদ তার বাবার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেছিলেন। কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার জানান, গত ২ সেপ্টেম্বর বাবা-মাকে সঙ্গে নিয়ে অফিসে আসেন ফাহাদ। পরে তাকে ডেলিভারিম্যান হিসেবে মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে কাজে নেওয়া হয়।
তবে তখনো তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক কোনো চুক্তি হয়নি। কাজের ধরন ও পরিস্থিতি দেখে এক মাস পর আনুষ্ঠানিক চুক্তি করার কথা ছিল বলে জানান অপ্রতিমের বাবা।
তার ভাষ্য, কাজ শুরুর পর ফাহাদের আচরণ ও কাজ ভালোই ছিল।
ফাহাদের সঙ্গে অপ্রতিমের আগে থেকেই পরিচয় ছিল কি না, সে বিষয়েও তাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ফিরোজ শাহরিয়ার। ফাহাদ তখন জানিয়েছিলেন, একটি গ্রুপের মাধ্যমে অপ্রতিমের সঙ্গে তার পরিচয় এবং তিনি তাকে ভালোভাবেই চিনতেন।
ফোন নেওয়ার পর বদলে যায় পরিস্থিতি
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবারের সঙ্গে ফাহাদের যোগাযোগ থাকলেও পরদিন তার ফোন নেওয়ার পর পরিস্থিতি বদলে যায় বলে জানান তার বাবা।
ফিরোজ শাহরিয়ারের ভাষ্য, সিসিটিভি ফুটেজে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমকে দেখা যাওয়ার বিষয়টি সামনে এলে ফাহাদই ফুটেজের ব্যক্তিকে তুহিন হিসেবে শনাক্ত করেন।
এরপর অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের স্থানমুখী একটি মোটরসাইকেলে তিনজনের সঙ্গে ফাহাদও ছিলেন বলে জানতে পারে পরিবার। সেখানে গিয়ে অসুস্থ বোধ করার কথা বলে তিনি সরে যান বলে জানান ফিরোজ শাহরিয়ার।
পরে ফাহাদের নম্বর থেকে তুহিনের নম্বরে ফোন করা হয়েছিল বলেও পরিবার জানতে পারে। ওই ফোনকলের সূত্র ধরেই পরে ফাহাদকে আটক করা হয় বলে জানান অপ্রতিমের বাবা।
নির্দোষ কেউ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়
অপ্রতিমকে খুঁজতে ফাহাদসহ কয়েকজনের সহযোগিতা পাওয়ার কথা উল্লেখ করে কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, শুরুতে তারা ফাহাদকে নিয়ে কোনো সন্দেহ করেননি।
তিনি বলেন, অপ্রতিমের সন্ধানে শুরুতে ফাহাদসহ কয়েকজন সহযোগিতা করছিলেন। তাই তাদের কারও বিরুদ্ধে এমন কোনো সন্দেহ পরিবারের মাথায় আসেনি।
অপ্রতিমের বাবা বলেন, তার সন্তান মারা গেছে। তবে এ ঘটনায় কোনো নির্দোষ মানুষ যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এটাই তার চাওয়া। তদন্তের মাধ্যমে যারা প্রকৃতভাবে জড়িত, তাদের শনাক্ত করার দাবি জানান তিনি।
বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে হত্যার ধারণা বাবার
অপ্রতিম কখন হত্যার শিকার হতে পারে, সে বিষয়েও নিজের ধারণার কথা জানিয়েছেন তার বাবা। তার মতে, বিকেল ৫টা থেকে ৬টার মধ্যে ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।
ফিরোজ শাহরিয়ার বলেন, রাত ১০টার দিকে তিনি ফাহাদের বাসার কাছে গিয়ে তাকে বাইরে আসতে বললে ফাহাদ স্বাভাবিকভাবেই বেরিয়ে আসেন এবং অপ্রতিমকে খুঁজতে সহযোগিতা করেন। এ কারণে ওই সময় পর্যন্ত ফাহাদের বিরুদ্ধে পরিবারের কোনো সন্দেহ তৈরি হয়নি বলে জানান তিনি।
নিখোঁজ হওয়ার প্রায় ২২ ঘণ্টা পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর হত্যাকাণ্ডের তদন্তে একে একে সামনে আসতে থাকে তুহিন, ফাহাদ ও কামরুলের সম্পৃক্ততার তথ্য বলে জানিয়েছে পুলিশ।
kalprakash.com/IM