চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এমন দাবিকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। ছড়িয়ে পড়া তথ্যে দাবি করা হয়, সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার সময় শি হঠাৎ জ্ঞান হারান। পরে তিনি স্ট্রোকে আক্রান্ত হলে জরুরিভিত্তিতে বিশেষ বিমানে তাঁকে বেইজিংয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। চীন বা ভারত—কোনো দেশের সরকারই দাবিটির সত্যতা নিশ্চিত করেনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি পোস্টে পরে কমিউনিটি নোট যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়েছে, পোস্টে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব তথ্যের মিল নেই। গত ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেন শি চিনপিং। সাত বছর পর এটিই ছিল তাঁর প্রথম ভারত সফর।
সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠক করেন শি। বৈঠকে ভারত-চীন সম্পর্ক, সীমান্ত পরিস্থিতি ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়। সম্মেলনে শি ব্রিকস দেশগুলোকে পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত সমাধানে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, চলমান যুদ্ধ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অভিন্ন স্বার্থের জন্য সহায়ক নয়। এ সময় শি ঘোষণা করেন, আগামী বছর ব্রিকসের সভাপতির দায়িত্ব নেবে চীন। একই সঙ্গে ১৯তম ব্রিকস সম্মেলনও চীনে অনুষ্ঠিত হবে।
সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন শি। তবে সেদিন রাতে মোদির দেওয়া নৈশভোজে তিনি অংশ নেননি। ভারত মণ্ডপমে ওই নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনসহ ব্রিকসের কয়েকজন নেতা অংশ নেন। শির পরিবর্তে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই।
শি কেন নৈশভোজে অংশ নেননি, সে বিষয়ে ভারত বা চীন কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যস্ত দিনের পর বিশ্রামের জন্য শি হোটেলে ফিরে যান।
এর আগে সম্মেলনে মোদির বক্তব্যের সময় শির সঙ্গে একটি সংক্ষিপ্ত কথোপকথনও হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, মোদি চীনের প্রতিনিধিদলের দিকে তাকিয়ে শির উদ্দেশে বলেন, ‘সব ঠিক আছে তো?’ শিকে তখন কিছু বলতে দেখা যায়। এরপর মোদি তাঁর বক্তব্য চালিয়ে যান।
এই ঘটনার পর এবং নৈশভোজে শির অনুপস্থিতিকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর স্বাস্থ্য নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়। ওয়ানজুন শিয়ে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, ব্রিকস সম্মেলনের সময় শি জ্ঞান হারিয়েছিলেন। সে সময় তাঁর সঙ্গে থাকা চিকিৎসকেরা জরুরি চিকিৎসা দেন বলেও দাবি করেন তিনি।
ওয়ানজুনের দাবি, এরপর শিকে বিশেষ বিমানে করে বেইজিংয়ে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। বেইজিং পৌঁছানোর পর সামরিক হেলিকপ্টারে করে তাঁকে পিপলস লিবারেশন আর্মির জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয়, যা ৩০১ হাসপাতাল নামেও পরিচিত।
ওয়ানজুন আরও দাবি করেন, সেখানে চিকিৎসকেরা শির গুরুতর স্ট্রোক শনাক্ত করেন। পরে তাঁর অস্ত্রোপচার করা হয় এবং তাঁকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখা হয় বলেও দাবি করেন তিনি। নয়াদিল্লি থেকে বেইজিংয়ে ফেরার দীর্ঘ যাত্রার কারণে শির জরুরি চিকিৎসা পেতে দেরি হয় বলেও দাবি করেন ওয়ানজুন। তবে এসব দাবির কোনোটি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
শির অসুস্থতার দাবির বিপরীতে চীনের সরকারি সংবাদমাধ্যম ও সরকারি ওয়েবসাইট গোভ ডট সিএন-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নয়াদিল্লিতে ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর শি রবিবার সন্ধ্যায় বেইজিংয়ে ফিরে যান। তাঁর সফরসঙ্গীদের মধ্যে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক ব্যুরোর স্থায়ী কমিটির সদস্য কাই শি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ইও ছিলেন। তাঁরাও একই বিমানে দেশে ফেরেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ওই সরকারি প্রতিবেদনে শির স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো সমস্যার কথা বলা হয়নি।
এখন পর্যন্ত চীন বা ভারতের কোনো সরকারি সূত্রই বলেনি যে শি জ্ঞান হারিয়েছিলেন, স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়েছেন, তাঁর অস্ত্রোপচার হয়েছে কিংবা তাঁকে ৩০১ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
শির অসুস্থতার দাবি যিনি করেছেন, সেই ওয়ানজুন শিয়ে চীনা গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত একজন বিদ্রোহী। তিনি চায়না ডেমোক্রেসি পার্টির চেয়ারম্যান। চীনে নিষিদ্ধ এই রাজনৈতিক সংগঠনটি ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এর সঙ্গে ১৯৮৯ সালের তিয়ানআনমেন স্কয়ারের বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সাবেক কর্মীসহ বিভিন্ন গণতন্ত্রপন্থী ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন ওয়াং ইউচাই, ওয়াং দংহাই ও লিন হুই।
১৯৯৮ সালের জুনে তাঁরা চীনের ঝেজিয়াং প্রদেশের হাংঝৌ শহরের বেসামরিক বিষয়ক কর্তৃপক্ষের কাছে দলটি নিবন্ধনের চেষ্টা করেন। তবে প্রতিষ্ঠার পরপরই চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সংগঠনটিকে নিষিদ্ধ করে। দলটির কয়েকজন নেতা গ্রেপ্তার হন এবং তাঁদের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এরপর সংগঠনটির কার্যক্রম মূলত চীনের বাইরে থেকে পরিচালিত হতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশে দলটির শাখা ও কমিটি গড়ে ওঠে।
চায়না ডেমোক্রেসি পার্টি বহুদলীয় সাংবিধানিক গণতন্ত্র, সরাসরি নির্বাচন, ক্ষমতার পৃথকীকরণ, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং আইনের শাসনের পক্ষে। সংগঠনটির ঘোষিত নীতির মধ্যে রয়েছে ‘সমৃদ্ধি, ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র’ এবং ‘স্বাধীনতা, আইনের শাসন, মানবাধিকার’। চীনে দলটি নিষিদ্ধ। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মানবাধিকারবিষয়ক প্রতিবেদন এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিভিন্ন প্রতিবেদনে সংগঠনটির বর্তমান ও সাবেক সদস্যদের ওপর চীনা কর্তৃপক্ষের নজরদারি, আটক ও কারাবন্দির ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে।
kalprakash.com/IM