জাপানের এক তরুণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শেষ করে জীবনের প্রথম চাকরি শুরু করেছিলেন একটি রিয়েল এস্টেট বিক্রয় প্রতিষ্ঠানে। কিন্তু দ্রুতই চাকরিটি তার জন্য কঠিন হয়ে ওঠে। প্রায়ই সহকর্মীদের বকুনি ও চিৎকার-চেঁচামেচি শুনতে হতো তাকে।
কী করবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না তিনি। টোকিওভিত্তিক শ্রম ও মানবসম্পদবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান লিডব্রেইনকে তিনি জানান, সহকর্মীরা তাকে কীভাবে দেখছেন বা তার সম্পর্কে কী ভাবছেন, তা বুঝতে না পেরে একসময় নীরবে চাকরি ছাড়ার পথ খুঁজতে শুরু করেন।
তবে চাকরি ছাড়লেও এমনভাবে ছাড়তে চাচ্ছিলেন, যাতে সহকর্মীদের সঙ্গে সংঘাত এড়ানো যায় এবং তার বাবা-মাও দুশ্চিন্তায় না পড়েন। তাই সরাসরি পদত্যাগপত্র জমা না দিয়ে এমন একটি প্রক্সি বা মধ্যস্থতাকারী সংস্থার খোঁজ শুরু করেন, যারা নিয়োগকর্তার সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছাড়াই চাকরি ছাড়তে সহায়তা করতে পারে।
‘বাক্কুরে’: না জানিয়ে চাকরি ছাড়া, কিন্তু দায়িত্বজ্ঞানহীনতা নয়
জাপানে কোনো নোটিশ না দিয়ে কর্মস্থল থেকে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াকে বলা হয় ‘বাক্কুরে’। বিষয়টি অনেকটা ডেটিংয়ের জগতে প্রচলিত ‘ঘোস্টিং’-এর মতো। বিশ্বের অনেক দেশে কোনো নোটিশ ছাড়া চাকরি ছেড়ে দেওয়াকে দায়িত্বজ্ঞানহীন মনে করা হলেও জাপানে বিষয়টি কিছুটা ভিন্নভাবে দেখা হয়।
জাপানে এভাবে কর্মস্থল থেকে উধাও হয়ে যাওয়া সরাসরি সংঘাত এড়ানোর এবং অন্তত বাহ্যিকভাবে পারস্পরিক সম্প্রীতি বজায় রাখার একটি উপায় হিসেবেও দেখা হয়।
টাকা দিন, নিরাপদে চাকরি ছাড়ুন
জাপানে চাকরি থেকে ইস্তফা দেওয়ায় সহায়তা করা প্রতিষ্ঠানের চাহিদা বাড়ছে। অ্যালবাট্রস এ কাজে বেশ সুপ্রতিষ্ঠিত। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় এ প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে গড়ে ৪৫০ জনকে নির্বিঘ্নে চাকরি ছাড়তে সহায়তা করে।
কী ধরনের চাকরি এবং কত দ্রুত তা ছাড়তে হবে, তার ওপর নির্ধারিত হয় ফি। পূর্ণকালীন চাকরি ছাড়তে হলে প্রত্যেক কর্মীকে দিতে হয় প্রায় ১২০ ইউরো বা ১৩৮ দশমিক ৫ মার্কিন ডলার। এই অর্থের বিনিময়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে চাকরি ছাড়ার প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে অ্যালবাট্রস।
অ্যালবাট্রসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইউকা হামাদা বলেন, শারীরিক সহিংসতা থেকে শুরু করে যৌন হয়রানিসহ নানা কারণে মানুষ তাদের সহায়তায় পদত্যাগ করতে চান। এ ধরনের পরিস্থিতিতে তারা বেশ অসহায় বোধ করেন এবং সরাসরি চাকরি ছাড়ার সাহস পান না।
শিকিগাকু নামের একটি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের জরিপ অনুযায়ী, জাপানে ২০ থেকে ৪৯ বছর বয়সী কর্মীদের প্রতি তিনজনের একজন কর্মক্ষেত্রে অন্তত কোনো না কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হন।
সবার ওপরে সম্প্রীতি
জাপানে প্রথাগত করপোরেট সংস্কৃতির উদ্ভব হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সময়ে। মূলত আজীবন কর্মসংস্থান ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা এই সংস্কৃতিতে সর্বোচ্চ গুণ হিসেবে বিবেচিত হয় আনুগত্য।
অধিকাংশ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পদত্যাগকে অবমাননা হিসেবে মনে করেন। তাই অনেক তরুণ কর্মী বসের মুখোমুখি হয়ে পদত্যাগের কথা বলতে ভয় পান।
রিক্কিও বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব সোশ্যাল ডিজাইন স্টাডিজের সহযোগী অধ্যাপক হিরোকি নাকামোরি বলেন, পদত্যাগের ইচ্ছা প্রকাশ করা কেবল চুক্তি বাতিলের মতো মনে হয় না; বিষয়টি অন্যদের হতাশ করতে পারে বা এতদিনের প্রত্যাশার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করার মতো অনুভূতিও সৃষ্টি করতে পারে।
জাপানের সংস্কৃতিতে সরাসরি সংঘাত এড়িয়ে চলার প্রবণতা বেশ প্রবল। কোনো প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের সংস্কৃতির প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হলে সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করা হবে—এটাই প্রত্যাশা করা হয়।
হিতোতসুবাশি ইউনিভার্সিটি বিজনেস স্কুলের হিউম্যান রিসোর্সেস ম্যানেজমেন্টের অধ্যাপক হিরোশি ওনো বলেন, যারা পারস্পরিক সম্প্রীতি বা ভারসাম্য নষ্ট করেন, তাদের ভালো চোখে দেখা হয় না। তাই চাকরি ছেড়ে যাওয়ার সময় কেউ হয়তো মনে করেন, কোনো রকম হইচই বা ঝামেলা ছাড়াই নীরবে সরে পড়াই শ্রেয়।
সুবিবেচনাপ্রসূত ‘ঘোস্টিং’
তবে কোনো চাকরি থেকে ‘ঘোস্টিং’ অর্থাৎ ‘ভদ্রভাবে’ সরে আসাও সম্ভব। অ্যালবাট্রসের সিইও হামাদা বলেন, অনেক সময় ক্লায়েন্টরা সরাসরি কোম্পানিকে বিদায় জানান না বা তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন না। সে ক্ষেত্রে এজেন্সি তাদের হয়ে সেই বার্তা পৌঁছে দিতে পারে।
তবে বিদায়-বার্তা পৌঁছে দিলেও নিজের ডেস্কটি চাকরি ছাড়তে মরিয়া ব্যক্তিকেই পরিষ্কার করে আসতে হবে। কারণ, জাপানের অনেক কর্মী ‘মেইওয়াকু’ নীতি মেনে চলাকে প্রায় বাধ্যতামূলক মনে করেন। মেইওয়াকুর মূল কথা হলো—অন্যদের জন্য ঝামেলা যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা এবং সর্বোপরি সমষ্টিগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা।
কর্মস্থল ছাড়ার আগে সেখান থেকে ব্যক্তিগত জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রেও মেইওয়াকুর বিষয়টি মনে রাখতে হয়।
অ্যালবাট্রসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ইউকা হামাদা বলেন, কোনো ক্লায়েন্ট কাজ থেকে পুরোপুরি সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেও তাকে চলে যাওয়ার আগে নিজের ডেস্ক পরিষ্কার করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
kalprakash.com/IM