ইসলামী শরিয়ত সম্পত্তির মালিকানা লাভের যেমন বিশেষ কিছু পদ্ধতি নির্ধারণ করে দিয়েছে, তেমনি সম্পত্তির মালিকানা অন্যের কাছে হস্তান্তরেরও কিছু সুনির্দিষ্ট নিয়ম বাতলে দিয়েছে। শরিয়তসম্মত উপায়ে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর মৌলিকভাবে দুই প্রকারে বিভক্ত—জীবদ্দশায় ও মৃত্যুর পর।
বিনিময় ও সময়ের বিচারে মালিকানা হস্তান্তরকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। বিখ্যাত ফিকহ গ্রন্থ তুহফাতুল ফুকাহাতে বলা হয়েছে, বিনিময় গ্রহণের মাধ্যমে জীবদ্দশায় কাউকে মূল সম্পত্তির মালিক বানানো হলো বিক্রয়। কোনো বিনিময় ছাড়া জীবিত অবস্থায় মূল সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করা হলো দান ও সদকা। কোনো বিনিময় ছাড়া জীবিত অবস্থায় কেবল উপকারের মালিক বানানোর নাম ধার। আর মৃত্যুর পর কোনো বিনিময় ছাড়া সম্পদ ও উপকারের মালিক বানানোর নাম অসিয়ত। (তুহফাতুল ফুকাহা : ৩/২৮৩)
জীবিত অবস্থায় মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি
১. বিক্রয়: কোনো মূল্য বা বিনিময়ের বিপরীতে অন্যকে কোনো সম্পত্তির মালিক বানানোই হলো বিক্রয়। শরিয়তে বেচাকেনা সম্পূর্ণরূপে বৈধ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন, ‘আল্লাহ মানুষের জন্য ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’ (সুরা : বাকারাহ, আয়াত : ২৭৫)
ফকিহদের মতে, বিক্রয় শুদ্ধ হওয়ার সাতটি প্রধান শর্ত রয়েছে: ক. ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের পারস্পরিক সন্তুষ্টি থাকা। খ. ক্রেতা ও বিক্রেতা চুক্তিসম্পন্ন করার যোগ্য হওয়া; অর্থাৎ স্বাধীন, সাবালক ও সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন হওয়া। গ. পণ্য শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ হওয়া। ঘ. পণ্য বিক্রেতার মালিকানাধীন হওয়া অথবা মালিকের পক্ষ থেকে বিক্রয়ের বৈধ অনুমতি থাকা। ঙ. পণ্যের নাম, বৈশিষ্ট্য, গুণাবলি ও পরিমাণ সম্পর্কে ক্রেতা-বিক্রেতা অবগত হওয়া। চ. পণ্যের মূল্য সুনির্দিষ্ট হওয়া। ছ. পণ্য হস্তান্তরযোগ্য হওয়া। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ : ২/৩৮৭)
২. হেবা বা দান: কোনো প্রকার বিনিময় ছাড়া জীবদ্দশায় কাউকে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর করাকে হেবা বলে। হানাফি মাজহাব অনুসারে হেবা শুদ্ধ হওয়ার শর্তগুলো হলো: ক. ইজাব ও কবুল; অর্থাৎ দাতার প্রস্তাব ও গ্রহীতার সম্মতি। খ. সম্পত্তির ওপর দাতার হস্তক্ষেপের বৈধ অধিকার থাকা। গ. দাতা সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন, সাবালক ও স্বাধীন হওয়া। ঘ. দানকৃত সম্পত্তি বাস্তবে বিদ্যমান থাকা। ঙ. দানকৃত সম্পত্তির আর্থিক মূল্য থাকা। চ. দানকৃত সম্পত্তি ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়া; সবার জন্য উন্মুক্ত কোনো জনসম্পত্তি না হওয়া। ছ. সম্পত্তি যৌথ মালিকানাধীন ও অবণ্টিত না হওয়া। জ. দানকৃত সম্পত্তি গ্রহীতার হস্তগত হওয়া। দখল ও নিয়ন্ত্রণ (কবজ) ছাড়া হেবা সম্পন্ন হয় না। (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, পৃষ্ঠা : ৩৮৭১)
৩. সদকা: আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কাউকে কোনো কিছু প্রদান করাকে সদকা বলে। হেবা ও সদকা উভয়টি দান হলেও উভয়ের মধ্যে কিছু মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। যেমন—সদকার মূল উদ্দেশ্য সওয়াব লাভ, তবে হেবার ক্ষেত্রে পরকালীন উদ্দেশ্য আবশ্যক নয়। সদকা মূলত দরিদ্র ও অসহায়দের দেওয়া হয়, আর হেবা ধনী-দরিদ্র সবাইকে দেওয়া যায়। এছাড়া হেবা ঐচ্ছিক, কিন্তু জাকাত ও সদকাতুল ফিতরের মতো সদকাগুলো ফরজ ও ওয়াজিব। সদকা শুদ্ধ হওয়ার শর্ত হলো: ক. নিয়ত শুদ্ধ হওয়া; অর্থাৎ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সদকা করা। খ. সম্পত্তি হালাল এবং তা বৈধ উপায়ে অর্জিত হওয়া। গ. প্রকৃত হকদারকে প্রদান করা। বিশেষত জাকাত ও ফিতরা নির্ধারিত খাতেই প্রদান করতে হবে। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ)
৪. ওয়াকফ: আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে কোনো সম্পত্তির মূল অংশ অবিকৃত বা অক্ষুণ্ন রেখে তার উপকার বা ফল ভোগ করার অধিকার উন্মুক্ত করে দেওয়াকে ওয়াকফ বলে। (আল মুগনি : ৬/৫)
ওয়াকফ শুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ: ক. ওয়াকফকারীর মালিকানা বৈধ ও নিরঙ্কুশ হওয়া। খ. ওয়াকফকারী সাবালক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন হওয়া। গ. ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আর্থিক মূল্য থাকা। ঘ. সম্পত্তির পরিমাণ সুস্পষ্ট ও জ্ঞাত হওয়া এবং তা এজমালি সম্পত্তি না হওয়া। ঙ. ওয়াকফ করার সময় সম্পত্তি দাতার মালিকানায় থাকা। চ. সম্পদে অন্যের অধিকার বা দাবি সম্পৃক্ত না থাকা। ছ. প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সম্পত্তি থেকে উপকার গ্রহণের সক্ষমতা থাকা। জ. ওয়াকফকৃত উদ্দেশ্যে শরিয়তসম্মত কল্যাণ থাকা। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ : ২/৪৯৬)
৫. মুআওয়াজা: কোনো পণ্যের বিনিময়ে অন্য পণ্য বা সম্পত্তি লেনদেন করাকে মুআওয়াজা বলে। এটি এক প্রকারের বেচাকেনা। যেসব শর্তে বিক্রয় চুক্তি বৈধ হয়, সেসব শর্তেই মুআওয়াজা চুক্তিও বৈধ হয়। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ : ৩৮/১৮৭)
৬. সুলাহ: বিবদমান দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে বিবাদ মীমাংসা করার চুক্তিকে সুলাহ বলে। এর মাধ্যমেও সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর হতে পারে। সুলাহ বৈধ হওয়ার শর্তসমূহ: ক. উভয় পক্ষ সাবালক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন হওয়া। খ. যে বস্তু বা সম্পত্তির বিনিময়ে সুলাহ হচ্ছে, তা শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ ও মূল্যবান হওয়া। গ. নিজের নিরঙ্কুশ মালিকানাধীন সম্পদের বিনিময়ে সুলাহ করা। ঘ. সম্পত্তির পরিমাণ নির্দিষ্ট ও স্পষ্ট হওয়া। ঙ. সুলাহের বিষয়ে পক্ষদ্বয়ের অধিকার সুপ্রমাণিত হওয়া। চ. বিষয়টি বান্দার অধিকারসংক্রান্ত হওয়া; আল্লাহর হকের পরিপন্থী না হওয়া। (বাদায়িউস সানায়ি : ৬/৪০; আল মুগনি : ৪/৪৮২)
মৃত্যুর পর মালিকানা হস্তান্তরের পদ্ধতি
মৃত্যুর পর দুই উপায়ে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরিত হয়:
১. অসিয়ত: শরিয়তের পরিভাষায় কোনো ব্যক্তি তার মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার শর্তে অপর কাউকে কোনো সম্পত্তি বা ঋণের মালিক বানানোকে অসিয়ত বলে। কোনো ব্যক্তি তার মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ সম্পদ ওয়ারিশ নন এমন ব্যক্তির জন্য অসিয়ত করতে পারেন।
অসিয়ত শুদ্ধ হওয়ার শর্তসমূহ: ক. প্রস্তাব ও গ্রহণ (ইজাব ও কবুল) থাকা। খ. অসিয়তকারী সাবালক, সুস্থ বুদ্ধিসম্পন্ন ও স্বাধীন হওয়া। গ. অসিয়তকারীর পূর্ণ স্বেচ্ছাসম্মতি থাকা। ঘ. যার জন্য অসিয়ত করা হচ্ছে, সে জীবিত ও নির্দিষ্ট হওয়া। ঙ. গ্রহীতা মালিকানা লাভের যোগ্য হওয়া। চ. অসিয়তকারীকে হত্যাকারী ব্যক্তি এর উত্তরাধিকারী বা সুবিধাভোগী হতে পারবে না। ছ. যার জন্য অসিয়ত করা হচ্ছে, সে অসিয়তকারীর স্বাভাবিক ওয়ারিশ না হওয়া। জ. অসিয়তকৃত সম্পত্তি শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ সম্পদ ও মূল্যবান হওয়া। ঝ. অসিয়তের সময় সম্পদটি দাতার বৈধ মালিকানাধীন থাকা। (আল মাউসুয়াতুল ফিকহিয়্যাহ : ৪৩/২৮১-২৮৩)
২. উত্তরাধিকার: রক্ত ও আত্মীয়তার সম্পর্কের ভিত্তিতে মৃত ব্যক্তির সম্পত্তির বৈধ প্রাপক হওয়াই হলো উত্তরাধিকার। পবিত্র কোরআনে এ বিধানের বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হয়েছে।
উত্তরাধিকার কার্যকর হওয়ার শর্তসমূহ: ১. মূল মালিকের (মুরিস) মৃত্যু অকাট্যভাবে প্রমাণিত হওয়া। ২. মূল মালিকের মৃত্যুর সময় উত্তরাধিকারীর জীবিত থাকা। ৩. মৃত ব্যক্তির সঙ্গে উত্তরাধিকারীর বৈধ সম্পর্ক সুপ্রমাণিত হওয়া। ৪. দাস না হওয়া। ৫. উত্তরাধিকারী কর্তৃক মূল মালিককে হত্যা না করা। ৬. ধর্ম ভিন্ন না হওয়া; অর্থাৎ মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে পারস্পরিক উত্তরাধিকার স্বত্ব প্রযোজ্য হয় না। (আল ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, পৃষ্ঠা : ৭৭০৭)
kalprakash.com/IM