রাশিয়ার বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের বিশাল ব্যয়ভার সামলাতে রাজস্ব আয়ের নতুন পথ খুঁজছে ইউক্রেন। এর অংশ হিসেবে দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক বিনোদন শিল্পকে (অ্যাডাল্ট কনটেন্ট খাত) বৈধ কাঠামোর আওতায় এনে কর আরোপের একটি প্রস্তাব পার্লামেন্টে উত্থাপন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বছরে সর্বোচ্চ আড়াই কোটি (২৫ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার কর আদায় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউক্রেনের পার্লামেন্টের অর্থবিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান ও বিলটির অন্যতম প্রণেতা ইয়ারোস্লাভ ঝেলেজনিয়াকের মতে, এই খাত থেকে সংগৃহীত অর্থ দিয়ে বছরে প্রায় ৩০ হাজার সামরিক ড্রোন কেনার খরচ মেটানো সম্ভব। দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে এনডিটিভি।
বর্তমানে ইউক্রেনের বিদ্যমান আইনে যেকোনো ধরনের পর্নোগ্রাফি তৈরি, সংরক্ষণ বা বিতরণ সম্পূর্ণ বেআইনি এবং এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনলাইনে ইউক্রেনীয় ক্রিয়েটরদের তৈরি প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টের ব্যবসা দ্রুত গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে।
এই পরিস্থিতি দেশটিতে এক অদ্ভুত আইনি জটিলতার সৃষ্টি করেছে। যারা এই খাত থেকে আয় করছেন, তারা কর কর্তৃপক্ষের কাছে আয়ের হিসাব ঘোষণা করলে সেই তথ্যের ভিত্তিতেই উল্টো তাদের বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি আইনে মামলা দায়েরের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। আর আয় গোপন রাখলে তাদের মুখোমুখি হতে হচ্ছে কর ফাঁকির মামলার। এই পরিস্থিতিকে অবাস্তব ও দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেছেন আইনপ্রণেতা ঝেলেজনিয়াক।
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের তথ্য অনুযায়ী, জনপ্রিয় সাবস্ক্রিপশন প্ল্যাটফর্ম ওনলি ফ্যানসের মূল প্রতিষ্ঠান ফেনিক্স ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে ২০২৩ সালে প্রায় ৭ হাজার ৯০০ ইউক্রেনীয় নাগরিক প্ল্যাটফর্মটি থেকে ১৩ কোটি ১০ লাখ ডলারের বেশি আয় করেছেন। কিন্তু কর কাঠামোর সমন্বয় না থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল আকার নিয়েছে। কিয়েভ কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে অনেক নির্মাতাকে কর ফাঁকি ও অবৈধ কনটেন্ট তৈরির অভিযোগে পৃথক নোটিশ পাঠিয়েছে।
এদিকে এই খাতকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির গুরুতর অভিযোগও উঠেছে। ইউক্রেনের সরকারি কৌঁসুলির দপ্তর তিনটি অঞ্চলে পুলিশ কর্মকর্তাদের ঘুষ নেওয়ার ঘটনা শনাক্ত করেছে, যেখানে ঘুষের অঙ্ক ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত ছিল।
এক ভুক্তভোগী কনটেন্ট নির্মাতা সভিতলানা দ্বোরনিকোভা জানান, মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর সময় পুলিশ তার বাড়িতে অভিযান চালিয়ে নগদ ২০ হাজার ডলার, ল্যাপটপ ও হার্ডড্রাইভ জব্দ করে। পরে মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার বিনিময়ে তার কাছে বিপুল অঙ্কের ঘুষ দাবি করা হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমন আইনি অনিশ্চয়তার কারণে অনেক কনটেন্ট নির্মাতা ইউক্রেন ছেড়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে চলে গেছেন।
কর আইনজীবী লেসিয়া মিখালেঙ্কো মনে করেন, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সময়ে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্ট নির্মাতাদের বিরুদ্ধে মামলা পরিচালনা করা রাষ্ট্রের মূল্যবান সম্পদের অপচয় এবং বিচার বিভাগের ওপর অনাবশ্যক চাপ সৃষ্টি করছে।
পরবর্তীতে দ্বোরনিকোভা বিষয়টি সরাসরি সরকারের নজরে আনতে প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ওয়েবসাইটে একটি গণআবেদন দাখিল করেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারে প্রায় ৯ লাখ ডলার কর দেওয়ার পরও তাকে অপরাধী বিবেচনা করা অযৌক্তিক। আবেদনটি প্রকাশের মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে ২৫ হাজারের বেশি নাগরিক তাতে স্বাক্ষর করেন। ব্যাপক জনসমর্থনের মুখে প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানান, পর্নোগ্রাফি বৈধ করার বিষয়টি পার্লামেন্টে বিবেচনা করা হবে। আইনপ্রণেতা ঝেলেজনিয়াকের নেতৃত্বে তৈরি এই বিলটি ইতোমধ্যে পার্লামেন্টে প্রথম দফার অনুমোদন পেয়েছে এবং বর্তমানে তা চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য দ্বিতীয় দফার ভোটের অপেক্ষায় রয়েছে।
ইউক্রেনের যুদ্ধকালীন বার্ষিক সামরিক ব্যয় প্রায় ১২০ বিলিয়ন ডলার। সেই তুলনায় সম্ভাব্য আড়াই কোটি ডলার সামান্য হলেও বিলটির সমর্থকদের যুক্তি, বাস্তবে যে শিল্প ইতোমধ্যে বড় পরিসরে সক্রিয় রয়েছে, তাকে বৈধতার আওতায় আনলে একদিকে যেমন সামরিক তহবিলের রাজস্ব বাড়বে, তেমনি বন্ধ হবে পুলিশি হয়রানি ও বিচার বিভাগের দীর্ঘসূত্রতা।
সূত্র: দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল
kalprakash.com/IM