শনিবার, ২৯ আগস্ট, ২০২৬ | ১৩ ভাদ্র, ১৪৩৩ | ১৫ রবিউল আউয়াল, ১৪৪৮ | ভোর ৪:১৭:৫৭

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৩৮৯, নিখোঁজ ৭০০ পর্যটক

অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৪৭
শেয়ার: mail
নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৩৮৯, নিখোঁজ ৭০০ পর্যটক

কাল প্রকাশ। ছবি: সংগৃহীত

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা গতকাল বৃহস্পতিবার শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ৩৮৯ জনে পৌঁছেছে। নেপাল পুলিশের তথ্যের বরাতে স্থানীয় সূত্রগুলো এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। এ ঘটনায় দেড় হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ৩০টিরও বেশি দেশের অন্তত ৭০০ পর্যটক রয়েছেন। তবে এ বিপর্যয়ে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে কাঠমান্ডুর বাংলাদেশ দূতাবাস।

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, যেকোনো সময় দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফায় একই ধরনের বন্যা আঘাত হানতে পারে। বৈরী আবহাওয়া ও প্রতিকূল পরিস্থিতির কারণে দুর্গত এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গতকাল নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং পৃথকভাবে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।

গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমালয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটির ধস নদীতে আছড়ে পড়ে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। প্রবল স্রোতে বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুতগতিতে নদী উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে মানববসতি, রাস্তাঘাট, সেতু ও বিদ্যুৎ স্থাপনা ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

এ ঘটনায় রয়টার্সের প্রতিবেদনে প্রাথমিকভাবে বলা হয়, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটতে পারে। তবে ভূকম্পনসংক্রান্ত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানায়, ভূমিকম্পের কারণে নয়, বরং বিশাল ভূমিধসের ফলেই ওই ভূকম্পনজনিত শক্তি তৈরি হয়েছিল। এতে নেপালের মধ্যাঞ্চলীয় বাগমতি প্রদেশের রসুয়াসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও হতাহতের ঘটনা ঘটে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার সঙ্গে এই দুর্যোগের যোগসূত্র রয়েছে। বন্যার প্রবল স্রোত ভোটেকোশি ও ত্রিশূলীসহ সংশ্লিষ্ট নদী অববাহিকা দিয়ে নেমে আসায় যোগাযোগব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং উদ্ধারকাজ চালানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও নতুন শঙ্কা ভয়াবহ এই ভূমিধস ও বন্যায় চীন ও নেপাল উভয় অংশেই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। চীনের ভূতত্ত্ববিদ গুও ঝাউচেং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানান, বুধবারের ভূমিধসটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০ মিটার বেগে ধেয়ে আসে এবং অতি দ্রুত ২০ কিলোমিটারের বেশি দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। চোখের পলকে ঘটে যাওয়ায় মানুষ সতর্ক হওয়ার সুযোগ পর্যন্ত পায়নি। দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজে প্রায় ৬০০ কর্মী মোতায়েন করেছে চীন।

এদিকে স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যায় একটি নদীর প্রবাহে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়ে কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়েছে। ক্রমাগত পানি জমে এটি ফুলে-ফেঁপে উঠছে, যা ভেঙে যেকোনো মুহূর্তে প্রবল বেগে পানি ছড়িয়ে পড়ার মারাত্মক শঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিতে থাকা নদী তীরবর্তী বাসিন্দাদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ধ্বংসযজ্ঞের শিকার দেবীঘাটের বাসিন্দারা জানান, বহু ঘরবাড়ি কাদার নিচে চাপা পড়েছে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় চরম খাদ্যসংকটে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নিখোঁজ পর্যটক ও উদ্ধার অভিযান দুর্যোগে ৩০টির বেশি দেশের অন্তত ৭০০ পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন, যার মধ্যে ভারতীয় নাগরিকের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল জানান, অন্তত ৩০০ ভারতীয় পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন, যাঁদের বেশিরভাগই কৈলাস মানসসরোবর যাত্রার তীর্থযাত্রী ছিলেন। তিনি বলেন, কয়েক ঘণ্টার মধ্যে একের পর এক এলাকা ভেসে গেছে এবং হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়েছে।

চীনা বার্তা সংস্থা নিজ দেশে ৩ জনের মৃত্যু ও ৫৫৮ জন নিখোঁজ হওয়ার খবর দিয়েছে, যার মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে তাদের প্রায় ১০০ পর্যটক নিখোঁজ আছেন। নিখোঁজদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ৬৫, ইউক্রেনের ৫৫, মালয়েশিয়ার ৫১, অস্ট্রেলিয়ার ৩৫, যুক্তরাজ্যের ৩৩, কানাডার ২৫, রাশিয়া, জার্মানি ও সিঙ্গাপুরের ৮ জন করে এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ও লাটভিয়ার ৬ জন করে নাগরিক রয়েছেন। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, নিউজিল্যান্ড, ফ্রান্স, বেলজিয়াম ও স্পেনসহ অন্যান্য দেশের নাগরিকও নিখোঁজ রয়েছেন।

নেপালের পাহাড়ি ও দুর্গম অঞ্চলে আটকে পড়া জীবিতদের উদ্ধারে জোর তৎপরতা চালাচ্ছে নেপালি কর্তৃপক্ষ ও রেড ক্রস। হেলিকপ্টারযোগে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এলাকাগুলোতে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ফেলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ত্রিশূলী এলাকায় নিখোঁজ ১০০ ভারতীয় ও ২৫ জন চীনা নাগরিকের অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।

হিমালয় অঞ্চলে জমে থাকা হিমবাহ গলে তৈরি হওয়া প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে সৃষ্ট এই আকস্মিক প্রবল স্রোতধারাকে ‘হড়পা বান’ (ফ্ল্যাশ ফ্লাড) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও বাংলাদেশের ত্রাণ সহায়তা এ দুর্যোগে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম ৫০ লাখ পাউন্ড জরুরি সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন এবং রাজা তৃতীয় চার্লস গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করে ওষুধ, ত্রিপল, স্লিপিং ব্যাগ, কম্বল ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেটসহ জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠিয়েছেন। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন ত্রাণ সহায়তা দিচ্ছে।

নেপালে ভয়াবহ বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী নিহতদের পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে যেকোনো ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

মানবিক সহায়তার অংশ হিসেবে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নেপালে জরুরি ত্রাণসামগ্রী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ত্রাণসামগ্রীর মধ্যে রয়েছে তাঁবু, মশারি, শুকনো খাবারের প্যাকেট, টর্চলাইট, বেলচা, স্লিপিং ব্যাগ, ওয়াটার কনটেইনার এবং বডি ব্যাগ। পররাষ্ট্র ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের যৌথ তত্ত্বাবধানে এসব ত্রাণ দ্রুত নেপালে পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

kalprakash.com/IM

এই সম্পর্কিত আরও সংবাদ

সব দেখুন arrow_forward
Logo
শুক্রবার, ২৮ আগস্ট ২০২৬ | Globe kalprakash.com

নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে নিহত বেড়ে ৩৮৯, নিখোঁজ ৭০০ পর্যটক

বিস্তারিত কমেন্টে