প্রযুক্তির সঙ্গে মানুষের দৈনন্দিন জীবন যত বেশি যুক্ত হচ্ছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের (AI) ব্যবহারও তত দ্রুত গতিতে বাড়ছে। পড়াশোনা, দাপ্তরিক কাজ, তথ্য অনুসন্ধান থেকে শুরু করে নানা সৃজনশীল কার্যক্রমে এআই এখন অনেকেরই নিয়মিত ভার্চ্যুয়াল সহকারী। তবে সুবিধার পাশাপাশি এআই ব্যবহারে রয়েছে নানাবিধ ঝুঁকিও।
বিশেষ করে সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা বড় ধরনের সমস্যার কারণ হতে পারে। তাই প্রযুক্তির যথাযথ ও নিরাপদ ব্যবহারের স্বার্থে কোন কোন ক্ষেত্রে এআই ব্যবহার থেকে বিরত থাকা উচিত, তা জেনে রাখা জরুরি।
জেনে নিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে যে ১১টি কাজ কখনোই করা উচিত নয়—
১. শারীরিক অসুস্থতার চিকিৎসা ও ওষুধ নির্বাচন: শারীরিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসকের বিকল্প হিসেবে এআই ব্যবহার করা উচিত নয়। উপসর্গ দেখে এআই কিছু সম্ভাব্য তথ্য দিতে পারলেও সঠিক রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
২. মানসিক স্বাস্থ্যের জটিল সমস্যা মোকাবিলা: তীব্র মানসিক চাপ, হতাশা বা গুরুতর মানসিক সমস্যার ক্ষেত্রে শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এ ধরনের পরিস্থিতিতে প্রশিক্ষিত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সিলরের সহায়তা নেওয়া জরুরি।
৩. জরুরি পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ: অগ্নিকাণ্ড, দুর্ঘটনা বা যেকোনো তাৎক্ষণিক বিপদের মুহূর্তে এআইয়ের পরামর্শ খোঁজা নিরাপদ নয়। এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় জরুরি সেবা (যেমন—৯৯৯ বা ফায়ার সার্ভিস) ও প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীদের নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
৪. গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত ও বিনিয়োগ: বিনিয়োগ, ঋণ গ্রহণ, কর বা ব্যক্তিগত অর্থ ব্যবস্থাপনার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে এআইয়ের পরামর্শকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক নয়। আর্থিক ক্ষেত্রে সবসময় সংশ্লিষ্ট পেশাদার বিশ্লেষক বা পরামর্শকের মতামত নেওয়া প্রয়োজন।
৫. সংবেদনশীল ও গোপন তথ্য শেয়ার: পাসওয়ার্ড, ব্যাংকিং তথ্য, ব্যক্তিগত গোপনীয় নথি কিংবা অফিসের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা-সংক্রান্ত কোনো তথ্য এআই প্ল্যাটফর্মে দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। এতে তথ্যের গোপনীয়তা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
৬. বেআইনি কাজে সহায়তা নেওয়া: অবৈধ বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পরিকল্পনা কিংবা বাস্তবায়নে এআই ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রযুক্তির মাধ্যমে কোনো বেআইনি কাজ করলেও এর আইনি দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায় না।
৭. পরীক্ষা ও অ্যাসাইনমেন্টে নকল করা: পরীক্ষা বা অ্যাসাইনমেন্টে এআইয়ের তৈরি উত্তর সরাসরি নিজের নামে জমা দেওয়া শিক্ষার্থীদের মৌলিক চিন্তাশক্তি ও শেখার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। এছাড়া এটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নিয়মনীতিরও স্পষ্ট লঙ্ঘন।
৮. যাচাই ছাড়া ব্রেকিং নিউজ বিশ্বাস করা: এআই সবসময় সর্বশেষ বা শতভাগ নির্ভুল তথ্য দেবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। বিশেষ করে ব্রেকিং নিউজ ও সংবেদনশীল খবরের ক্ষেত্রে মূলধারার বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যম ও নির্ভরযোগ্য মূল উৎস থেকে তথ্য যাচাই করে নেওয়া জরুরি।
৯. জুয়ায় জেতার কৌশল খোঁজা: জুয়ায় নিশ্চিতভাবে জেতার কোনো অলৌকিক কৌশল এআই দিতে পারে না। এ ধরনের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে অর্থ ঝুঁকিতে ফেলা একেবারেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
১০. গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি প্রস্তুত: উইল, চুক্তিপত্র কিংবা যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি তৈরিতে এআইয়ের লেখা সরাসরি ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সবসময় সংশ্লিষ্ট আইন ও অভিজ্ঞ আইনজীবীর পরামর্শ নেওয়া উচিত।
১১. অনুমতি ছাড়া ডিপফেক তৈরি: কারও ছবি, কণ্ঠ বা ভিডিও ব্যবহার করে তাঁর অনুমতি ছাড়া বিভ্রান্তিকর ডিপফেক কনটেন্ট তৈরি করা গুরুতর আইনি ও নৈতিক অপরাধ।
সবশেষে মনে রাখা প্রয়োজন, এআই একটি শক্তিশালী সহায়ক প্রযুক্তি হলেও এটি চিকিৎসক, আইনজীবী, আর্থিক বিশেষজ্ঞ কিংবা মানুষের নিজস্ব বিচার-বিবেচনাবোধের বিকল্প নয়। তাই এআইকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তথ্য যাচাই এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
kalprakash.com/IM