অভাব-অনটন ও মায়ের ক্যানসার দমিয়ে রাখতে পারেনি রাঙামাটির বরকলের অদম্য মেধাবী শিক্ষার্থী মাইমুনাকে। নানা প্রতিকূলতা জয় করে ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বরকল উপজেলার ভূষণছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে বাণিজ্য বিভাগে জিপিএ-৪.৮৩ পেয়ে সবাইকে চমকে দিয়েছে সে। দুর্গম বরকল উপজেলায় তার এই ফলাফল যৌথভাবে দ্বিতীয়।
জানা গেছে, শাহজাহান আলী শান্ত ও আমেনা বেগম দম্পতির তিন সন্তানের মধ্যে সবার বড় মাইমুনা। ভূষণছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের পাঠদানের অনুমোদন অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত থাকায় উপজেলার শুভলং উচ্চ বিদ্যালয়ের মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন করে পরীক্ষায় অংশ নিতে হয় তাকে। তবে নিয়মিত পাঠদানসহ যাবতীয় একাডেমিক কার্যক্রম চলে ভূষণছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকেই। অদম্য চেষ্টায় অর্জিত এই অর্জনের জন্য বাবা-মা ও শিক্ষকদের অনুপ্রেরণাকেই মূল চালিকাশক্তি বলে মনে করে এই শিক্ষার্থী।
ভবিষ্যতে শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে বাণিজ্য বিভাগে লেখাপড়া করলেও উচ্চশিক্ষার পথে এখন চরম আর্থিক সংকট বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কা থাকলেও লক্ষ্য অর্জনে নিজের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় রয়েছে মাইমুনার।
মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) সকালে মাইমুনার বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, অতিবৃষ্টিতে কাদা জমে যাওয়া পথ পেরিয়ে ঘরের কাদাময় উঠানে অসুস্থ মাকে গৃহস্থালি কাজে সহযোগিতা করছে সে। মাত্র এক কক্ষের ছোট্ট ঘরে গাদাগাদি করে রাখা আসবাবপত্রের ফাঁকেই রয়েছে তার পড়ার টেবিল। শত অভাব আর মায়ের অসুস্থতার মাঝেও পড়াশোনায় কখনো ছেদ পড়তে দেয়নি সে। এখন ভালো ফলাফলের আনন্দের পাশাপাশি পরিবারটিতে ভর করেছে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বহনের শঙ্কা।
মাইমুনার মা আমেনা বেগম বলেন, আমরা গরিব মানুষ। সংসারে অভাব-অনটন লেগেই আছে। এর মধ্যে আমি ক্যানসারে আক্রান্ত। তিন মেয়েকে নিয়ে খুব টানাটানির সংসার। তবে মাইমুনার পড়াশোনার প্রতি প্রবল আগ্রহ। নিজের ইচ্ছাতেই সে বাণিজ্য বিভাগে পড়েছে। অর্থাভাবে ঠিকমতো প্রাইভেটও পড়াতে পারিনি। মেয়েটা আরও অনেক দূর পড়তে চায়। কিন্তু কীভাবে ওর পড়ালেখা চালাব, তা জানি না।
বাবা শাহজাহান আলী বলেন, আমি একজন নৌকার পুডিং মিস্ত্রি। নৌকা মেরামতের সামান্য আয়ে সংসার চলে। মেয়ে ভালো রেজাল্ট করায় আমরা খুব আনন্দিত। সাধ্যমতো চেষ্টা করব মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে নেওয়ার জন্য। সবার কাছে দোয়া চাই।
মেধাবী মাইমুনা জানায়, নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার মায়ের ক্যানসার ধরা পড়ে। দশম শ্রেণিতে ওঠার পর মায়ের শারীরিক অবস্থা আরও খারাপ হয় এবং দীর্ঘদিন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি থাকতে হয়। সে জানায়, বাবার মলিন মুখ দেখে খুব কষ্ট হতো। তখন থেকেই জেদ চাপে যেভাবেই হোক ভালো ফলাফল করতেই হবে। তার স্বপ্ন ভালো কোনো কলেজে ভর্তি হয়ে ভবিষ্যতে শিক্ষক হওয়া। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও নিজের লক্ষ্য পূরণে লড়াই চালিয়ে যেতে চায় সে।
ভূষণছড়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. হাফিজুর রহমান জামাল বলেন, মেয়েটি নিঃসন্দেহে অত্যন্ত মেধাবী। তবে পারিবারিক নানা প্রতিকূলতা ওকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে। মা অসুস্থ থাকায় ঘরের রান্নাবান্নাসহ যাবতীয় কাজ সামলে ওকে নিয়মিত স্কুলে আসতে হতো। এরপরও সে দমে যায়নি, অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে জিপিএ-৪.৮৩ অর্জন করেছে। আর্থিক অনটন যেন এই মেধাবীর উচ্চশিক্ষার পথ রুদ্ধ করতে না পারে, সেজন্য সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় ব্যক্তিদের তার পাশে দাঁড়ানো উচিত।
kalprakash.com/IM